খেলাপি ঋণ আদায়ে তাকিয়ে ব্যাংকাররা

খেলাপি ঋণ আদায়ে তাকিয়ে ব্যাংকাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক :

দেশের ব্যাংকগুলোয় চলছে নগদ অর্থের সংকট। ঋণ দেয়ার মতো অর্থও নেই কোনো কোনো ব্যাংকে। ব্যাংকগুলো জর্জরিত খেলাপি ঋণে। আয়ের সিংহভাগই খেয়ে ফেলছে খেলাপি ঋণ। এই তারল্য সংকটের কারণে দেশের পুরো শিল্প ও ব্যবসা খাত উচ্চ চড়া সুদের কারণে ধুঁকছে। এই সুদহার বৃদ্ধির জন্য দায়ী তারল্য সংকট। ঠিক এ মুহূর্তে উচ্চ আদালতে ব্যাংক ঋণ মামলা পরিচালনার জন্য ‘বিশেষ বেঞ্চ’ গঠন করা প্রয়োজন। মামলা দ্রম্নত নিষ্পত্ত করে অর্থ আদায় করলে এ খাতের তারল্য সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন ব্যাংক মালিক ও নির্বাহীরা।

একাধিক ব্যাংক মালিক ও নির্বাহীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অর্থঋণ আদালতের মামলার রায়ের ৯০ শতাংশই আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আসে। কিন্তু আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঋণ খেলাপিরা উচ্চ আদালতে চাতুর্যপূর্ণভাবে রিট করছেন। যে কারণে খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে মূল মামলা। আর উচ্চ আদালতে অর্থঋণ মামলার শুনানির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বেঞ্চ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না।

তারা জানান, এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা নয়, উচ্চ আদালতে ব্যাংক ঋণ মামলা পরিচালনার জন্য এ মুহূর্তেই ‘বিশেষ বেঞ্চ’ গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। মামলাগুলো নিষ্পত্তি হলে ব্যাংকে যে তারল্য সংকট চলছে তা কেটে যাবে। এছাড়া বেঞ্চ গঠনের দায়িত্ব সরকারের কোন সংস্থা নেবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা দ্রম্নত এর সমাধান চান।

এ প্রসঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানায়, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় অর্থঋণ আদালতে ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ অর্থ আটকে রয়েছে। মামলা দ্রম্নত নিষ্পত্তির জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে অনেক আগেই আলাদা বেঞ্চ গঠনের কথা বলা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তাদের জানিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তিনি যায়যায়দিনকে বলেন, এ নিয়ে তিনি কোনো চিন্তাভাবনা করছেন না। কারণ, বেঞ্চ গঠন করবেন কি করবেন না তা সম্পূর্ণ প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার। এখানে আইন মন্ত্রণালয়ের কিছু করার নেই। আলাদা বেঞ্চ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। এ কাজটা করতে পারলে খেলাপি ঋণ আদায় হবে তাতে সন্দেহ নেই। এ বেঞ্চটা যত দ্রম্নত সম্ভব গঠন করে দেয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনমন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নিতে পারে না। তার কারণ বিচার বিভাগ স্বাধীন এবং বেঞ্চ দেয়ার এখতিয়ার প্রধান বিচারপতির। আমার মনে হয় এটা নিয়ে প্রধান বিচারপতির চিন্তাভাবনা রয়েছে।

তবে বেসরকারি খাতের ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা বলছেন, ঋণখেলাপিদের আইনের আওতায় সুবিচার নিশ্চিত করতে হলে মামলাগুলো দ্রম্নত নিষ্পত্তি করতে হবে। মামলাগুলো ঝুলে থাকায় ঋণখেলাপিরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। মামলা দ্রম্নত নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালতে আলাদা বেঞ্চ গঠন হলে ঋণখেলাপিরা টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হবেন। সুতরাং এ মুহূর্তে আদালতে বিশেষ বেঞ্চ গঠনের কোনো বিকল্প নেই।

এ ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবির) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী পরিচালক আনিস এ খান যায়যায়দিনকে বলেন, আলাদা বেঞ্চ গঠন এখন খুব দরকার এবং সময়ের দাবি। কারণ ব্যাংকগুলোতে এখন চরম তারল্য সংকট চলছে। মামলাগুলো নিষ্পত্তি হলে ব্যাংকের টাকার প্রবাহ বাড়বে। খেলাপিঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেক নির্দেশনা ও আইনকানুন হলেও কোনো কাজে আসছে না। খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। আলাদা বেঞ্চ করলে কম সময়ের মধ্যে মামলার রায় হবে। খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা যাবে। তবে এ মুহূর্তে আলাদা বেঞ্চ গঠনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। এ কাজটি আরও আগে করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র আরও জানায়, মূলত প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্য যাচাই না করে ঋণ দেয়া, ঋণের তদারকির অভাব ও মামলায় শাস্তির দৃষ্টান্ত না থাকার কারণে আদালতে বর্তমানে ঋণখেলাপিদের মামলার জট সৃষ্টি হয়েছে। অর্থঋণ আদালতে মামলা হলেও অনেক সময়ই সেখানে মামলার বিচারক থাকেন না। আর আসামিরাও খুব সহজেই জামিন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে মামলা নিষ্পত্তিতে পৃথক বেঞ্চ গঠনের বিকল্প নেই। অবশ্যই আলাদা গঠিত বেঞ্চকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে হবে। তা না হলে এ উদ্যোগ বর্তমান অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন আনবে না।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান যায়যায়দিনকে বলেন, ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইন যা আছে, তা ভালো। তবে সমস্যা বাস্তবায়নে। অনেক দিন ধরে উচ্চ আদালতে আলাদা একটা বেঞ্চ দাবি করেও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় একটা মামলা নিষ্পত্তি হতে ৭-৮ বছর লেগে যাচ্ছে। এখন সাময়িকভাবে খেলাপিঋণ কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিছু সার্কুলার দিয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দিয়েছিল। তাতে সাময়িকভাবে কিছুদিনের জন্য খেলাপিঋণ কমলেও দীর্ঘ মেয়াদে কাজ হয়নি। এখন চীন, মালয়েশিয়া, নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে।

তিনি বলেন, সব ব্যাংক মিলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বহুদিন ধরে দাবি করে আসছে অর্থঋণ আদালতের অধীনে আলাদা একটি বেঞ্চ করে দেয়ার জন্য। যা শুধু অর্থঋণ আদালতই পরিচালনা করবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইন কমিশনের সঙ্গে একটি মিটিংও করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলো পুরোপুরি হতাশ। সরকার আলাদা বেঞ্চ করে দিলে খেলাপিঋণ দ্রম্নত আদায় করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, অর্থঋণ আদালতের রায়ের ৯০ ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আসে। কিন্তু আইনি দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালতে চাতুর্যপূর্ণভাবে রিট করছেন। যে কারণে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অল্প টাকায় নিয়োজিত প্যানেলভুক্ত অনভিজ্ঞ আইনজীবীর চেয়ে ঋণখেলাপিদের আইনজীবীরা অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এতে উচ্চ আদালতে রিটের শুনানিতে যুক্তিতর্কে হেরে যায় ব্যাংক। পাশাপাশি দলীয় আনুগত্য ও তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের বিরুদ্ধে। সরকারি দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে তাদের যোগ্যতা নিয়ে কখনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। এ ছাড়া একটি মামলা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে একাধিক মামলা। এতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে মূল মামলা। আর উচ্চ আদালতে অর্থঋণ মামলার শুনানির জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক বেঞ্চ না থাকায় কাঙ্ক্ষিত হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে মামলার জট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এখানে আইনি জটিলতা আছে। তা না হলে ব্যাংক ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এমন জট সৃষ্টি হবে কেন। বিচারকের অভাব বা আইনে কোনো জটিলতা আছে কিনা তা শনাক্ত করতে হবে। এজন্য এর ভেতরে ঢুকতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন বা সংশোধন করে জট কমাতে হবে। এছাড়া উচ্চ আদালতে ব্যাংক ঋণ মামলা পরিচালনার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে (বর্তমানেও আইনমন্ত্রী) অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রম্নত নিষ্পত্তি করতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের অনুরোধ করে চিঠি দিয়েছিলেন। চিঠিতে অর্থমন্ত্রী অর্থঋণসংক্রান্ত রিটের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু এরপরও কোনো কাজ হয়নি। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে আইন কমিশন। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক এবং আইন কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. এম শাহ আলম ও বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর এ সুপারিশ করেন। এ সুপারিশ বাস্তবায়নেও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।

উলেস্নখ্য, আদালতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের গ্রাহকদের কাছ থেকে পাওনা ৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা আদায় করতে পারছে না। মামলাগুলোর মধ্যে অর্থঋণ আদালতে ৬ হাজার ৮৯১টি এবং রিট মামলা রয়েছে ১৮০টি। এর মধ্যে অর্থঋণ আদালতের মামলাগুলোর বিপরীতে আটকে আছে ২ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা এবং রিট মামলাগুলোর বিপরীতে আটকে আছে ৭২০ কোটি টাকা।

শেয়ার করুন