ইতিহাস-ঐতিহ্য

এক নজরে পুরান ঢাকার ইতিহাস

মারুফ হোসেন :

আমাদের বাংলাদেশের প্রাণ আজকের তিলোত্তমা নগরী রাজধানী ঢাকা। ঢাকা থেকেই দেশের ৬৪ জেলা পরিচালিত হয়ে আসছে। ঢাকা থেকে সারা দেশে স্থল ও নৌ পথে সরাসরি যাতায়াত করা যায়। শুধু তাই নয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জেলায় আকাশ  পথেও যাতায়াত করা যায়। ঢাকা বলতে এক সময় পুরান ঢাকাকে বোঝানো হতো। লোক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কালক্রমে ঢাকার পরিধি বাড়ানো হয়।জানা গেছে,পূর্বে সূত্রাপুর মিলব্যারাক পশ্চিমে হাজারীবাগ ট্যানারীর মোড় এবং দক্ষিণে সদরঘাট ও উত্তরে নবাবপুর পর্যন্ত পুরান ঢাকার সীমানা বিস্তৃত। পুরান ঢাকার আইন শৃংখলা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিএমপি’র গঠিত ৮টি থানা রয়েছে। হাজারীবাগ,লালবাগ,চকবাজার,বংশাল,কোতোয়ালী,সূত্রাপুর,ওয়ারী ও গেন্ডারিয়া থানা। পুরান ঢাকার পশ্চিমে মোহাম্মদপুর উত্তরে ধানমন্ডি,নিউমার্কেট,শাহবাগ,রমনা,মতিঝিল,সবুজবাগ,পূর্বে যাত্রাবাড়ী,শ্যামপুর এবং দক্ষিণে কামরাঙ্গীরচর থানা ও কেরানীগঞ্জ উপজেলা অবস্থিত। পুরান ঢাকার সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় এবং প্রধান বাহন হচ্ছে রিক্সা। বাণিজ্যিক জোন হিসেবে মালপত্র আনা-নেয়ার জন্য রাতের বেলায় পুরান ঢাকা ট্রাকের দখলে চলে যায়। পুরান ঢাকা দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র। সর্ব রকম পাইকারী পণ্যের জন্য দেশের ৬৪ জেলার পাইকাররা প্রতিদিন চকবাজারে আসেন। মৌলভীবাজার অপচনশীল পণ্যের জন্য বিখ্যাত। দেশের বৃহত্তম এবং এশিয়া মহাদেশের অন্যতম প্রধান চামড়া প্রক্রিয়াকরণ জোন হচ্ছে পুরান ঢাকার হাজারীবাগ এলাকা। চকবাজার মডেল থানাধীন পোস্তা এলাকা হচ্ছে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণ জোন। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যক জোন হচ্ছে নয়াবাজার,মিডফোর্ড,সিদ্দিক বাজার,    আলুবাজার, নবাবপুর, পাটুয়াটুলী, সদরঘাট,বংশাল,ইসলামপুর,বাদামতলী,শ্যামবাজার, ও ঈমামগঞ্জ। ঢাকাইয়া লোকজন মূলত ব্যবসায়ী। বংশ পরম্পরায় তারা ব্যবসা করে আসছেন। কালক্রমে এদের পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ,বিক্রামপুর ও নোয়াখালী জেলার লোকজন এখানকার ব্যবসায় প্রধান্য রাখছে। জানা গেছে,পুরান ঢাকার অধিকাংশ অধিবাসী ঢাকাইয়া। ঢাকাইয়া লোকজন মহানগরীর অন্যান্য এলাকার তুলনায় অধিকতর রক্ষণশীল। ঢাকাইয়াদের সংস্কৃতি আর দিল্লির স্থানীয় অধিবাসীদের সংস্কৃতি প্রায় একই রকম। ঢাকাইয়া লোকজন চালাক-চতুর হলেও তাদের ব্যবহার অত্যন্ত অমায়িক। অতিথি অপ্যায়ন এবং খাতির যতেœ ঢাকাইয়াদের জুড়ি নেই। ঢাকাইয়া সমাজে বড় এবং সিনিয়রদের সম্মান-শ্রদ্ধা ও সমীহ করার পাশাপাশি ছোটদেরকে শ্নেহ করার পুরনো রেওয়াজ এখনো বিদ্যমান। অধিকাংশ পুরান ঢাকার মুসলমানেরা অন্যান্য এলাকার তুলনায় অধিকতর ধর্মসচেতন। প্রত্যেক মহল্লায় একাধিক মসজিদ থাকার কারণে ঢাকা’কে মসজিদের নগরী বলা হয়। পুরান ঢাকায় হিন্দু ও খৃষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজনও বসবাস করেন। ঢাকাইয়ারা অত্যন্ত ভোজনরসিক প্রকৃতির। মুঘল প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে আগে থেকেই ভারতীয় খাবার গুলো পুরান ঢাকায় বেশ জনপ্রিয়। টিক্কা,জালি কাবাব,কাঠি কাবাব,শাম্মি কাবাব,বটি কাবাব,নার্গিস কাবাব,শিক কাবাব,দই বড়া,মূরগী মুসললাম,খাসির পায়া,কাচ্চি বিরিয়ানি,পাক্কি বিরিয়ানি,মোরগ পোলাও,নান রুটি,বাকর খানি বা সুখা রুটি,নেহারি,বোরহানি ও লাবাং ইত্যাদি। এছাড়া ঢাকাইয়াদের অধিক পছন্দের খাবার হচ্ছে বেচারাম দেউড়ীর নান্নার বিরিয়ানি,নাজিরা বাজারের হাজী বিরিয়ানি,বংশালের আল-রাজ্জাক,লালবাগের রয়েল হোটেল,কায়েৎটুলী এলাকার শমসের আলীর ভূনা খিচুড়ী,মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এলাকার মোস্তাকিমের কাবাব ও চকবাজারের নূরানী কোল্ড ড্রিংকস। এছাড়া সাতরওজা এলাকার আনন্দ বেকারী,চকবাজারের ডিসেন্ট বেকারী,আলাউদ্দিন সুইটমিটস এবং বোম্বের মিস্টান্ন ও বিস্কুট সামগ্রী।ঢাকাইয়া লোকজন উর্দ্দুর পাশাপাশি ঢাকাইয়া বাংলা ভাষায় কথা বলেন। একই রকম ভাষায় কথা বলেন কেরানীগঞ্জ উপজেলার লোকজন। ঈদুল ফিতর,ঈদুল আজহা ও শবে বরাত পুরান ঢাকার প্রধান ধর্মীয় উৎসব। পহেলা বৈশাখ সাড়ম্বর ভাবে পালিত হয়। পৌষ সংক্রান্তির দিনে ঢাকাইয়ারা ঘুড়ি উৎসবে মেতে উঠে। প্রতি বছর ১৪ বা ১৫ জানুয়ারীতে এই উৎসব পালিত হয়।  আনুষ্ঠানিক ভাবে হাজারীবাগ লেদার টেকনোলজি কলেজ মাঠে এবং পুরান ঢাকার অধিকাংশ বাড়ীর ছাদে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ঘুড়ি উড়ানো হয়। উত্তর ভারতে এই ঘুড়ির উৎসবকে সাকরাইন বলে। ঢাকা মহানগর সমিতি (ঢাকা সমিতি) নামক সংগঠনটি ঢাকাইয়াদের স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা হচ্ছে পুরান ঢাকার আরেকটি ঐতিহ্য। সামাজিক অন্যায়-অত্যাচার ও পারিবারিক বিরোধ নিরসন করা হতো পঞ্চায়েতী শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে। লালবাগের এমপি হাজী সেলিম প্রথম বার এমপি হওয়ার পর দেবীদাসঘাটের তাঁর বাড়ীতে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা চালু করেছিলেন যার সুফল পেয়েছিলেন এলাকার লোকজন। বিনা পয়সায় দ্রুত ন্যায় বিচার পাওয়ায় বাদী-বিবাদীকে থানা-পুলিশ বা কোর্ট-কাছারিতে যেতে হয়নি। পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা এখনো বিভিন্ন মহল্লায় বিদ্যমান রয়েছে। মহল্লার গন্যমান্য ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত পঞ্চায়েতের প্রধানকে বলা হয় সরদার।

Related Articles