প্রচ্ছ্দসারাদেশ

কুমিল্লায় ছোট-বড়’র লড়াইয়ে নিহত ১

রবিউল আলম"কুমিল্লা প্রতিনিধি"

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শিদলাই গ্রাম। জনসংখ্যা ও আয়তনে উপজেলার সবচেয়ে বড় এ গ্রামটিতে দু’টি গ্রুপের মাঝে দীর্ঘ এক শ’ বছর ধরে চলছে ‘আধিপত্যের লড়াই’। গ্রামের দক্ষিণ পাড়ায় ‘বড়দল’ ও ‘ছোটদলে’ বিভক্ত গ্রুপ দু’টি দীর্ঘ বছরে বংশ পরম্পরায় সংঘর্ষে জড়িয়েছে ২৫ বার। এসব সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন ৪ জন; আহত হয়েছেন শত শত নারী-পুরুষ।

মামলা হামলায় নি:স্ব হয়েছে অনেক পরিবার। শত বছর ধরে চলে আসা এ লড়াইয়ের শুরুর গল্প যেমন জানেন না কেউ; তেমনি জানা নেই ক্রমেই ভয়ানক হয়ে উঠা দুটি গ্রুপের প্রাণঘাতি এ সংঘাতের শেষ কোথায়।

সর্বশেষ গত ৮ সেপ্টেম্বর গ্রামটিতে পূর্ব বিরোধের জের ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহত হন ২জন। খোরশেদ আলম ও সানু মিয়া নামে নিহত ওই দুই ব্যক্তি ‘ছোট দলের’ সমর্থক ছিলেন। আর এ ঘটনার ১০ দিনের ব্যবধানে ১৯ সেপ্টেম্বর প্রাণ হারাতে হলো রমিজ আলী নামে ‘বড় দলের’ একজনকে। এছাড়াও গতবছর দু’গ্রুপের মধ্যে এমনি এক প্রাণঘাতি সংঘর্ষে নিহত হন ‘বড় দলের’ লিডার মফিজুল ইসলাম।

শিলদাই গ্রামবাসী ও আশপাশের এলাকার লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেলো, ‘বড়দল-ছোটদলের’ আধিপত্যের বিরোধ ক্রমেই পরিণত হয়েছে ‘অহমিকার লড়াইয়ে’। ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে-সমান’ গ্রুপ দুটিকে এক বিন্দুতে মেলানো যাচ্ছে না কিছুতেই। সামান্য বাকবিতান্ডা থেকেই শুরু হয় হামলা-পাল্টা হামলা। টেটা-বল্লম-রাম দাসহ দেশীয় অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত একই গ্রামের একই পাড়ার দুটি গ্রুপ জড়িয়ে পড়ে প্রাণঘাতি সংঘর্ষে।

বিষয়টির সাথে একমত পোষণ করে শিদলাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ বলেন, সিদলাই গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার ৯নং ওয়ার্ডের এ দু’টি গ্রুপ দীর্ঘ প্রায় ১০০ বছর ধরে বিরোধে জড়িয়ে আছে।

বিষয়টি এখন তাদের কাছে ‘অহমিকার লড়াইয়ে’ পরিণত হয়েছে। নিজের দেখা ও এলাকার মুরুব্বীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জেনেছি গ্রুপ দু’টি এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ বার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। দু’পক্ষই বিষয়টিকে নিজেদের ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে নিয়েছে- যার ফলে এ সংঘর্ষ থামানো যায়নি। তবে আমরা এর শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই; প্রাণহানি-রক্তপাতের অবসান চাই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী জাহাঙ্গীর খান চৌধুরী বলেন, ‘শিদলাই গ্রামের এ দুটি পক্ষকে কিছুতেই একসাথে মেলানো যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে বারংবার চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হতে হচ্ছে। সাবেক আইনমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আবদুল মতিন খসরুও কয়েকদফা চেষ্টা করেছেন।’ কিন্তু এ ‘রহস্যে’র জট খুলছে না কিছুতেই। তবে তিনি আশাবাদী, অচিরেই দু’টি পক্ষকে এক বিন্দুতে মিলানো যাবে।

জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, ‘দুটি গ্রুপ বছরের পর বছর এভাবে সংঘর্ষে জড়িয়ে থাকবে; খুন-খারাবী হবে- তা মেনে নেয়া যায় না। এমপি আবদুল মতিন খসরু কয়েকদিন আগে শিদলাই গিয়েছিলেন তাদেরকে এক করতে। নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে সমন্বয় করে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন- অচিরেই বিষয়টি সুরাহা হয়ে যাবে।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ব্রাহ্মণপাড়া ও দেবীদ্বার সার্কেল) শেখ মোহাম্মদ সেলিমের সাথে। তিনি বলেন, প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা এ বিরোধ হঠাৎ করেই মীমাংসা করা যাবে না। তবে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। গত পরশুদিন (সোমবার) মাননীয় এমপি আবদুল মতিন খসরুসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক হয়েছে। আশারাখি খুব সহসাই বিষয়টির একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে।

পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সিদলাই গ্রামে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তারা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। ‘উত্তাপ’ কিছুটা কমে আসলেই আমরা বিষয়টির সমাধানের দিকে এগুবো।

খোজ নিয়ে জানা গেছে, শিদলাই গ্রামে ‘ছোটদল-বড়দলের’ এ লড়াই এতো বছর হামলা-পাল্টা হামলা ও মামলা-মোকদ্দমায় সীমাবদ্ধ থাকলেও গতবছর থেকে তা ‘প্রাণঘাতি’ রূপ নিয়েছে। ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে এরকমই একটি সংঘর্ষে প্রাণ হারান ‘বড় দলের’ লিডার মফিজুল ইসলাম। এরপর থেকেই ‘ছোট দলের’ লোকজন মামলার ভয়ে এলাকা ছাড়া ছিলো।

কিন্তু ৮ সেপ্টেম্বর শনিবার ভোরে হঠাৎ করেই ‘ছোটদলের’ লোকজন সংঘবদ্ধ হয়ে ‘বড় দলের’ সমর্থকদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালাতে শুরু করে। ‘বড় দল’ও চালায় পাল্টা আক্রমণ। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান ‘ছোট দলের’ লিডার খোরশেদ আলম।

সংঘর্ষে গুরুতর আহত ‘ছোট দলের’ শুকুর ওরফে সানু মিয়াকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার কিছুক্ষণ পড় মারা যান তিনিও। ভয়াবহ এ সংঘর্ষ ও দু’জনের প্রাণহানির ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বুধবার (১৯) সেপ্টেম্বর উদ্ধার করা হয়েছে ‘বড় দলের’ সমর্থক রমিজ আলীর লাশ। আগের হত্যাকান্ডে ঘটনার দায়ের করা মামলায় তিনি এজহারনামীয় আসামি। গ্রেফতার এড়াতে রমিজ বাড়ি পাশের পুকুরের কোণে বাঁশের মাচা পেতে সেখানে রাত্রিযাপন করতেন বলে জানা গেছে।

ব্রাহ্মণপাড়া থানার ওসি) সৈয়দ আবু মো. শাহজাহান বলেন, শিদলাই গ্রামে অধিক পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *