মিন্নির জবানবন্দি নেয়া হয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে

মিন্নির জবানবন্দি নেয়া হয়েছে ভয়ভীতি দেখিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক :

মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর অভিযোগ করেছেন ভয়ভীতি দেখিয়ে তার মেয়ের কাছ থেকে সাজানো জবানবন্দি আদায় করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার মেয়ে কোনোভাবেই জড়িত নয়।

বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এর পর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পুলিশ বলেছে, মিন্নি রিফাত হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ততার দায় স্বীকার করেছেন। কিন্তু কতটুকু দায় স্বীকার করেছেন, হত্যাকান্ডের কোন অংশে তিনি জড়িত এ ব্যাপারে পুলিশ কোনো কিছু জানায়নি।

রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বরগুনা থানার পরিদর্শক হুমায়ূন কবির বলেছেন, শুক্রবার (গতকাল) বিকাল সাড়ে ৫টায় মিন্নিকে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম গাজীর আদালতে হাজির করা হয়। মিন্নি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তার কাছে আমাদের জানার আর কিছু নেই, তাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা থেকে আইনজীবী আসার কথা শুনেই কি এই তড়িঘড়ি? তাকে নির্যাতন করেই এই জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছেন, জবাবে হুমায়ূন কবির তা অস্বীকার করেন।

তবে মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেছেন, ক্ষমতাসীনরা মিন্নির পক্ষে বরগুনার কোনো আইনজীবীকে দাঁড়াতে দেননি। ঢাকা থেকে আইনজীবীরা আসবে শুনে পুলিশ নির্যাতন করে তড়িঘড়ি আমার মেয়েকে দিয়ে মিথ্যা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করিয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে আমার মেয়েকে গ্রেপ্তার করে মামলায় জড়ানো হয়েছে। এখন আবার তাকে দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও রেকর্ড করানো হলো। এর মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে। আমি আইনি লড়াই করে সত্যটা বের করব ইনশাল্লাহ।

মোজ্জাম্মেল হোসেন আরও বলেন, ‘মেয়ে আমার জীবন বাজি রেখে তার স্বামীকে রক্ষা করতে গেছে। এটাই তার অপরাধ? এসব কিছুই শম্ভু বাবুর (স্থানীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু) খেলা। তার ছেলে সুনাম দেবনাথকে সেভ করার জন্য আমাদের বলি দেওয়া হচ্ছে।’

মিন্নিকে যখন আদালত থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন তাকে পুলিশের দুজন নারী সদস্য ধরে ছিলেন। ছোট পিকআপে তোলার সময় মিন্নি কিছু একটা বলার জন্য উদ্যত হয়েছিলেন। কিন্তু পাশে থাকা নারী পুলিশ সদস্য এ সময় মিন্নির মুখ চেপে ধরেন।

গত মঙ্গলবার জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে মিন্নিকে ডেকে নিয়ে রাতে রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। পরদিন বুধবার পুলিশ মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করে। একই বিচারক শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডের ২ দিনের মাথায় পুলিশ গতকাল বিকালে মিন্নিকে আদালতে হাজির করে। পরে বিচারকের খাসকামরায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক হুমায়ুন কবির বলেছেন, ৫ দিনের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হলেও মিন্নির কাছে আমাদের যা জানার ছিল তা জানা হয়ে গেছে। আদালতে তিনি কী বলেছেন সে সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।

এর আগে মঙ্গলবার বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেছিলেন, রিফাত হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গত ২৬ জুন রিফাতকে প্রকাশ্য সড়কে কুপিয়ে হত্যার সময় স্বামীকে বাঁচাতে মিন্নির চেষ্টার ভিডিও ইন্টারনেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি সারাদেশে আলোচনায় উঠে আসে।

পরদিন শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ ১২ জনকে আসামি করে যে মামলাটি করেন, তাতে প্রধান সাক্ষী করা হয় মিন্নিকেই।

গত শনিবার মিন্নির শ্বশুর তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত বলে এক সংবাদ সম্মেলন দাবি করেন। এতে হত্যা মামলাটি নতুন মোড় নেয়। পরের দিন রবিবার শ্বশুরের অভিযোগ অস্বীকার করে মিন্নি বলেন, প্রভাবশালীদের চাপের মুখে তার শ্বশুর বানোয়াট অভিযোগ এনেছেন। রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ছয়জন ও মিন্নিসহ মোট ১৩ জনকে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড গত ২ জুলাই পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

রিশান ফরাজি ৫ দিনের রিমান্ডে
বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৩ নম্বর আসামি রিশান ফরাজিকে ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছে আদালত। গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টায় তাকে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

শেয়ার করুন