খোলা কলাম

টার্গেট করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে আসে তাদের খাঁচায়

হাফিজুর রহমান :

ঢাকার শহরের ব্যস্ততম সড়কের পাশে একটি বাসায় দুই যুবক মোবাইলে তুলছে একজন পুরুষ ও নারীর বিবস্ত্র নগ্ন ছবি। নির্বাক পুরুষ, নির্বাক নারী সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায় আছে দাঁড়িয়ে। একের পর এক বিভিন্ন এ্যাঙ্গেলে মোবাইলে ক্লিক শব্দে উঠছে ছবি। হঠাৎ দরজায় কলিং বেল ওঠে বেজে। জিজ্ঞেস করতেই উত্তর আসে ‘পুলিশ’। দরজা খুলতেই প্রবেশ করে স্থানীয় থানা পুলিশের এক সাব ইন্সপেক্টর। বাসার মধ্যে এখনও দন্ডায়মান নগ্ন পুরুষ ও নারী। সাব ইন্সপেক্টর তার মোবাইলেও তুলেন ছবি। তারপর ফোন দিয়ে বলেন “ওসি স্যার, ইনফরমেশন সঠিক আছে, ভিকটিম এবং আসামি দুজনকেই নিয়ে থানায় আসছি”। লিখতে থাকেন ভিকটিম ও আসামির নাম ঠিকানা। এর কিছুক্ষণ পরেই আসে একজন পত্রিকার  সাংবাদিক। তিনি অফিস থেকে ফোনে খবর পেয়ে এসেছেন জানতে ঘটনার সত্যতা। ডিএসএলআর ক্যামেরায় দুজনের নগ্ন ছবি তুলে জানতে চান ঘটনার সূত্রপাত। ভিকটিম জানায় দরজায় কলিং বেল বাজলে তিনি দরজা খুলে দিলে এই পুরুষ লোকটি বাসায় ঢুকে। এরপর তাকে জোরপূর্বক বিবস্ত্র করে ধর্ষনের চেষ্টা চালায়। রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ পেয়ে এই দুই ব্যক্তি না আসলে তার সম্ভ্রম বাঁচানো ছিলো দায়।এবার যেতে হবে তাদের থানায়, দিতে হবে মামলা। আসামি চালান হবে কোর্টে আর ভিকটিমকে ডাক্তারী পরীক্ষা ও জবানবন্দি দিতে যেতে হবে সাথে। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে ২৫/৩০ বছরের নারী, সংসার ভেঙ্গে যাবে তার। আর প্রায় ষাট বছর বয়সের পুরুষ লোকটির মান সম্মান যাবে ধুলোয় মিশে। নিজেকে নিরপরাধ প্রমানের জন্য বারবার ব্যর্থ চেষ্টা যাচ্ছেন করে। মহিলাটির আত্মহত্যা ছাড়া থাকবে না কোন উপায় বলে পায়ে পড়েন সাংবাদিক ও পুলিশ অফিসারের। সম্ভম বাঁচানো দুইজন স্থানীয় ব্যক্তিও এবার অনুরোধ করেন মানবিক বিবেচনায়। পুলিশ অফিসার অনড়, তিনি জানিয়েছেন ওসি সাহেবকে, আর সাংবাদিক বলছে এমন অমানবিক ও ঘুণিত কাজের হতে হবে বিচার। পুরুষ লোকটির নাম কাজল (ছদ্দ নাম)। তার পুত্র ও স্ত্রীর মোবাইল নম্বর নিয়ে ফোন দিতে উদ্যত হয় সাংবাদিক। এবার কাজল পায়ে পড়েন সাংবাদিকের। ধর্মের বাবা ডেকে তাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু নিজ পেশায় তিনি কঠিন, কোন অন্যায়ের সাথে করেন না কখনও আপোষ। এবার কোন উপায়ন্তর না পেয়ে শরীরের সকল শক্তি সঞ্চয় করে আশপাশের লোকজন জড়ো করতে চিৎকার দেয় কাজল। আঘাতে আঘাতে কাজলকে করে দেয় কাতর। চোখ বেঁধে এ বাসা থেকে নেয়া হয় দুরের অন্য একটি বাসায়। সকালের ঘটনা গড়িয়েছে বিকেলে। এবার কাজলের ফোন থেকে দেয়া হয় তার স্ত্রীর নিকট কল। দাবী করা হয় তিন লক্ষ টাকা মুক্তিপণ। এক ঘন্টার মধ্যে টাকা না দিলে কেটে টুকরো করে দিবে নদীতে ভাসিয়ে। টাকা জোগাড় করে কাজলের নম্বরে ফোন দিলে দেয়া হবে ১৫টি বিকাশ নম্বর। পাঠাতে হবে টাকা সেই বিকাশে। সামান্য বিজ্ঞাপণ ব্যবসায়ী কাজলের স্ত্রীর পক্ষে এ টাকা দেয়া অসম্ভব। সন্ধ্যার পর মগবাজারের বাসা থেকে কলেজ পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে ছুটে যান হাতিরঝিল থানায়। সকালে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অফিস থেকে একটি বিজ্ঞাপনের অর্ডার নিতে যাচ্ছেন বলে ছেলেকে অফিসে আসতে বলে বেরিয়েছেন কাজল। এরপর থেকে প্রায় নিরুদ্দেশ। অপহরণকারী ফোন দিয়েছে কাজলের নম্বর থেকে। এর বেশি কিছু জানেন না তারা।হাতিরঝিল থানার অফিসার ইনচার্জ আবু মোঃ ফজলুল করিম বিষয়টি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের এডিসি হাফিজ আল ফারুক ও এসি সালমান হাসান সাহেবকে জানান। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা এবং তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় পরদিন রাত নয়টায় বাড্ডা থানার অফতাবনগর এলাকার শেষ প্রান্ত থেকে উদ্ধার হয় কাজল। করা হয় পুলিশ ও সাংবাদিক গ্রেফতার, তবে আসল নয় নকল। এবার থানায় নিয়ে আসলে কাজলের পরিবারে শুরু হয় কান্নার রোল। এক মর্মান্তিক ঘটনা শোনা যায় কাজলের নিকট থেকে।গত ১৩ নভেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় মগবাজার মোড়ে নিজস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যায় কাজল। সকাল পৌনে দশটায় দুজন লোক তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আসে। তারা ‘ক্রান্তি’ নামে একটি বেসরকারী সংস্থায় কাজ করে বলে জানায়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার জন্য বিভিন্ন সাইজের ১০০০ বিলবোর্ড তৈরী করতে হবে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কাজলকে তাদের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেয়। তিনি কাজলকে পশ্চিম রামপুরা এলাকায় অবস্থিত তার অফিসে আমন্ত্রণ জানায়। ছেলেকে তাড়াতাড়ি দোকানে আসতে বলে একজন কর্মচারী রেখে তাদের সাথে সিএনজি যোগে পশ্চিম রামপুরার উলনে চলে যায় কাজল। চেয়ারম্যান সাহেবকে ফোনে আসতে বলে সেই দুইজন লোক। দশ মিনিট পর সেখানে প্রবেশ করে ২৫/৩০ বছরের নারী। এসেই কাজলের গলায় ছুরি ধরে বিবস্ত্র করে। তারপর নারী নিজেও বিবস্ত্র হন। কাজলকে নিয়ে আসা দুজন তখন পথচারীর ভূমিকায়। এরপরের ঘটনা আগেই বলেছি।এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এরা এভাবেই টার্গেট করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে আসে তাদের খাঁচায়। তারপর বিভিন্ন পরিকল্পিত উপায়ে মুক্তিপণ করে আদায়। কেউ মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পায়, আর চক্ষু লজ্জায় ঘটনা চেঁপে যায়। কেউ পুলিশের সহায়তা নিয়ে এভাবেই উদ্ধার হয়। ঘটনায় মামলা রুজু হয়েছে হাতিরঝিল থানায়। গ্রেফতারকৃত ভুয়া পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর হানিফ ও ভুয়া সাংবাদিক এনাম রসুল খন্দকার শামীম গতকাল বিজ্ঞ আদালতে দিয়েছে স্বীকারাক্তিমূলক জবানবন্দি। ঘটনায় জড়িত পলাতক আসামীদেরকে চলছে গ্রেফতারের চেষ্টা। এমন সব পরিকল্পিত অপহরণকারীরা থাকে অনেক চতুর ও দক্ষ। তাদের চতুরতা ও দক্ষতাকে হার মানিয়ে এবার পুলিশের সক্ষমতা হয়েছে প্রমাণ।
পুলিশ সদর দপ্তর

Related Articles