শিরোনাম

আজ শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন


নড়াইলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কাঠের তৈরি খড়ম এখন শুধুই স্মৃতি

নড়াইলে আধুনিকতার ছোঁয়ায় কাঠের তৈরি খড়ম এখন শুধুই স্মৃতি

উজ্জ্বল রায় নড়াইল জেলা সংবাদদাতা: আশির দশকেও নড়াইল জেলায় অনেকেই ব্যবহার করতেন খড়ম। বাংলাদেশে খড়মের ব্যবহার অনেক প্রাচীন। ভারত উপমহাদেশের বিশিষ্ট আউলিয়া হযরত শাহজালাল (র:) ১৪শ শতকে বাংলাদেশর সিলেটে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তার ব্যবহৃত খরম এখনো তার সমাধিস্হল সংলগ্ন স্হাপনায় সংরক্ষিত আছে। সনাতন ধর্মে খড়মের ব্যবহার অনেক প্রাচীন তারা খড়মকে দেবতা ও শ্রদ্ধেয় সাধুসন্তদের পদচিহ্নের প্রতীকও মনে করেন অনেকে। সনাতন ধর্মের পাশাপাশি জৈনধর্মেও ভিক্ষাজীবি সন্ন্যাসী ও সাধুসন্তেরা খড়ম ব্যবহার করতেন। সনাতন ধর্মের মহাকাব্য রামায়ণে খড়মের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এক সময় সমগ্র দেশের মানুষই নির্ভরশীল ছিলো ঐ কাষ্ঠ পাদুকা (খড়ম) এর উপর। নড়াইল জেলা প্রতিনিধি উজ্জ্বল রায় জানান, কিছুকাল আগেও খড়মের শব্দে গৃহস্থরা বুঝতে পারতেন তাদের বাড়িতে কেউ আসছেন। রুপসীগ্রাম-বাংলারপরিবারের সবাই ব্যবহার করতেন এই কাঠের তৈরি খরম। নড়াইলের কুড়িগ্রামের বাসিন্দা সনাতন ধর্মের তরু কুন্ডু (৭০) জানান, আগে বাড়ীতে আতœীয় বা কুটুম আসলে একজোড়া খরম আর এক ঘটি/পিতলের এক ঘোটি জল দিতাম হাত ও মুখ ধৌত করার জন্য।তিনি আরও জানান যে,আগে এই খড়ম পরে বিবাহ হত। এই খড়ম পায়ে দিয়েই নববধূ তার শশুর বাড়ীতে যেত। আধুনিকতার ছোঁয়ায় কাঠের তৈরি খড়ম এখন শুধুই স্মৃতি। কালের বিবর্তনে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কাষ্ঠ পাদুকা খড়ম। এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। জানা যায়, চামড়া, রেকসিন, প্লাস্টিক, কাপড় ইত্যাদি দিয়ে তৈরি জুতা এখন মানুষের পায়ে শোভা বর্ধন করে। বিগত কয়েক বছর ধরে বার্মিস জুতায় ছেঁয়ে গেছে নড়াইল শহর-এমনকি গ্রাম বাংলার মানুষের পায়ে পায়ে। কাঠমিস্ত্রি শ্রী নিরমল চন্দ্র রায় জানান যে, কাঠ দিয়ে তৈরি খড়ম পরিবেশবান্ধব। তারপরও মানুষ এটিকে পরিহার করেছে। অপরদিকে বার্মিস জুতা মানুষের মাথা গরম করা, পায়ের নিচের স্তর চামড়া মোটা করে বয়রা নামক রোগের সৃষ্টি করে। বয়রায় আক্রান্ত হয়ে অনেকেই চিকিৎসকদের কাছে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, একখন্ড কাঠ পায়ের মাপে কেটে নিয়ে খড়ম তৈরি করা হয়। খড়মের সম্মুখভাগে একটি বর্তলাকার কাঠের গুটি বসিয়ে দেওয়া হয়, যা পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি ও পাশের আঙ্গুলি দিয়ে আকড়ে ধরা হয়। আর এটি আবিষ্কার হয়েছিল মূলত মানুষের পা এর নিরাপওা বিধানের জন্য। কিন্তু এখন কেবল নিরাপওাই যোগায় না, বরং এটি সজ্জারও একটি অংশ। আকতার মোলা জানান, ৭০ এর দশক পর্যন্তও জনপ্রিয় ছিল খড়ম। তবে, সে সময় পশুর চামড়ায় তৈরি জুতাও কম-বেশি ছিল। পরে যানবাহনের চাকায় ব্যবহৃত টায়ার ও টিউব কেটে তৈরি হয় এক ধরনের জুতা। যার নামকরণ করা হয় টায়ার জুতা। কালের বিবর্তনে ঐ টায়ার জুতাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায়। এর পর আসে সেন্ডেল। বর্তমানে বিভিন্ন মডেলের সেন্ডেলে বাজার সয়লাব। শিক্ষক সুলতান মাহামুদ, জানান একটি কাষ্ঠ পাদুকা খড়ম তৈরি করতে (মজুরি ও কাঠের দাম বাবদ) বর্তমান বাজারে খরচ পড়ে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। পক্ষান্তরে বার্মিসের একটি পাদুকা পাওয়া যায় মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। দাম সাশ্রয়ী হওয়ায় সবাই বার্মিসের জুতাই ব্যবহার করেন। পৌর কমিসনার মাহাবুর আলম জানান, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও বার্মিস জুতা ব্যবহার করতে হচ্ছে। খড়ম পায়ে দিয়ে চলাফেরা করলে বেমানান মনে হয়, বিধায় ইচ্ছা থাকলেও আর খড়ম ব্যবহার করি না। তবে, এখনও খড়ম পায়ে দিয়ে চলাফেরা করেন এমন মানুষও কম-বেশি রয়েছে । মূলত তারাই ধরে রেখেছেন প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খড়ম। ব্যবহারকারী কমে যাওয়ায় পরিবেশবান্ধব কাষ্ঠ পাদুকা বিলুপ্তপ্রায়। খড়ম শিল্পের সাথে জড়িত কারিগররাও কমে যাচ্ছেন।এভাবে কালের বির্বতনে হারিয়ে যাচ্ছে কুড়িগ্রাম জেলা থেকে ঐতিহ্যবাহী কাষ্ঠ পাদুকা (কাঠের তৈরি খড়ম)

শেয়ার করুন