সম্পাদকীয়

পাশে থাকুন কিশোরদের

সাঈদ চৌধুরী

কিশোরদের চেহারায় ও কণ্ঠের পরিবর্তন যখন খুব বেশি পরিলক্ষিত, তখন তাদের প্রতি অবহেলাও কিন্তু আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। যেকোনো কাজই যখন কিশোরদের দোষের, তখন তারা কীভাবে মানুষের কাছে ভালো ছেলে হিসেবে প্রকাশিত হবে! আমাদের সমাজে যখন কোনো ছোট ছেলে আস্তে আস্তে কিশোরে পরিণত হতে থাকে, তখন তাদের সব পরিবর্তন যেন একটি দায়। কেউ দেখলেই ভাবে এ ছেলে বুঝি ধূমপান করে অথবা খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মেশে অথবা ছেলেটি খুব উগ্র। চুলের কাটিং যদি সামান্য কিছুটা অন্যরকম হয় তবে তো কথাই নেই। মায়েদের কাছেও কখনও কখনও এ কিশোররা অবহেলিত হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের ফটিক চরিত্রের কৈশর এখনও তার দস্যিপনার কারণেই সমাজের চোখে অপরাধী। এমন একটি চিন্তাধারা যেন কিশোর বয়সটিই অপরাধের! এ ভাবনায় অপরাধী করে তোলা কিশোরদের মনোভাবও তাদের খারাপের দিকে ঠেলে দেয়। সবাই যখন সামান্য বিষয়গুলোতেই তার ওপর দোষ চাপাতে থাকে, তখন মানসিকভাবে সে অভাবী হয়ে পড়ে। সে ভাবতে শুরু করে, সে-ই বুঝি এক ধরনের বোঝা। এক পর্যায়ে হতাশা তাদের বিপথেও ঠেলে দিতে পারে।
আমাদের সমাজে এখনও কিশোরদের বয়ঃসন্ধিকালীন এ সময়টাকে খুব গুরুত্বহীনভাবে দেখা হয়। পরিসংখ্যানে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কিশোর অপরাধের মতো বড় অপরাধগুলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় কিশোররা গ্যাং হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। তার মানে দাঁড়ালো কিছু কিছু সময় কিশোররাই অপরাধের প্রধানতম কারণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে নেশা, যৌন হয়রানি, রাতে বাইরে থাকার মতো ব্যাপারগুলোও খুব চোখে পড়ার মতো হয়ে উঠছে। বই পড়া থেকে বের হয়ে অনেক কিশোরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মরণ গেমস নিয়ে মেতে উঠছে। ব্লু হোয়েলের মতো গেমস যদি কিশোরবেলা থেকেই কারও মনের মধ্যে গেঁথে যেতে থাকে এক পর্যায়ে সে কিশোরই হয়ে উঠছে ভয়ঙ্কর আত্মঘাতী।
ভাবনায় প্রসারতা কতটা কমেছে মানুষের তা কিছু ঘটনা দেখলেই স্পষ্ট হবে। সেদিন দেখলাম এক কিশোর রাস্তায় হাঁটছে কানে এয়ারফোন লাগিয়ে। আমি দেখলাম একজন মুরুব্বি মানুষ ছেলেটিকে দেখে বলছেনÑ কী ধরনের ছেলে দেখ গান শুনতে শুনতে হাঁটে! অথচ আমি জানি ছেলেটি একটি ভালো পরিবারের। আমি তাকে ডেকে বলি তুমি কেন এয়ারফোন লাগিয়ে হাঁটছ। সে আমাকে দেখে শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে বলেÑ ভাইয়া এমনিতেই। আমি তাকে বললাম এতে অনেক ধরনের সমস্যা হতে পারে তুমি কি তা ভেবেছ? সে বলল, কী ধরনের বলেন তো ভাইয়া। আমি বললাম, তুমি অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটলে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়তে পার, ছিনতাইকারীর কবলে পড়তে পার এবং মানুষ তোমাকে দেখে কিছু নেগেটিভ চিন্তাও করতে পারে।
সে সঙ্গে সঙ্গে এয়ারফোন খুলে বলল, আমি বুঝতে পেরেছি ভাই, আর এমনটা করব না। আমি তার প্রতি খুশি হলাম আর ভাবলাম আমি ওকে না বললে ও এ কাজটি করতেই থাকত। হ্যাঁ, কিশোর বয়সটিতে সবকিছুই যদি অপরাধের মনে হয়; তবে কিশোররা অপরাধে জড়াবেই। এ কারণে তাদের পাশে দাঁড়ানোটা খুবই জরুরি। তাকে যেমন তার ইচ্ছেমতো চলতে দিতে হবে পাশাপাশি তার ওপর রাখতে হবে নিয়ন্ত্রণও; তাই বলে তাকে অধিকারহীন করবেন বা অপরাধী ভাববেনÑ এটা কখনোই সঠিক নয়।
নতুনভাবে ভাববার সময় এসেছে। কিশোরবেলা থেকেই সাধারণত যেহেতু অপরাধ শুরু হয় সুতরাং এখন থেকেই এ ব্যাপারে আরও সচেতন হতে হবে। কিশোরদের সঙ্গে আলোচনা বাড়াতে হবে, তাদের স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে হবে এবং তাদের ওপর রাখতে হবে আস্থা। আস্থা রাখতে গেলে তাদের সাপোর্ট করতে হবে, বোঝাতে হবে তারাই এ দেশের সবচেয়ে কার্যকরী ও মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। শিশুবেলা থেকেই যেহেতু এখন সন্তানরা তথ্যপ্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে সুতরাং তাদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্যপ্রযুক্তি তাদের উৎকর্ষতা দিতে পারে।
বখাটে অথবা ভদ্রÑ এ দুইয়ের যেকোনো দিকেই নিয়ে যেতে পারে কিশোরবেলা অবহেলা বা যতন। এ বিষয়গুলো খেয়াল করে সামনে দিকে উদ্দেশ্য ঠিক করে দিতে পারলেই কিশোরবেলা হয়ে উঠতে পারে আদর্শ সময়।

রসায়নবিদ ও সদস্য, উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি
শ্রীপুর, গাজীপুর