ইসলাম

পাশে দাঁড়ান শীতার্ত মানুষের

ইসলাম ডেস্ক :

শীতার্ত মানুষের প্রতি সমাজের সামর্থ্যবান ও বিত্তশালীদের সাহায্য ও সহানুভূতির হাত সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ঋতুর পালাবদল ঘটে। প্রচ- শীতের প্রকোপ থেকে আত্মরক্ষার জন্য হতদরিদ্র অনেক মানুষেরই নেই ন্যূনতম শীতবস্ত্র, খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপথ্য, উপযুক্ত আশ্রয় বা বাসস্থান। হাড়-কাঁপানো শীতে ছিন্নমূল অসহায় মানুষের খড়কুটা জ্বালিয়ে শীত মোকাবিলা করতে হয়। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে শীতবস্ত্র সরবরাহ করে সাধ্যমতো শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। তাই সবার প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। যার অন্তরে দয়া-মায়া আছে, যে পরোপকারী আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, রুগ্ণ ব্যক্তির সেবা কর এবং বন্দিকে মুক্ত কর অথবা ঋণের দায়ে আবদ্ধ ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত কর।’ (বোখারি শরিফ)।
নিঃস্বার্থভাবে বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য ও সেবা করাই মানবধর্ম। এ মহৎ ও পুণ্যময় কাজই সর্বোত্তম ইবাদত। অসহায় মানুষের সাহায্য, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার মন-মানসিকতা যাদের নেই, তাদের ইবাদত-বন্দেগি আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সুতরাং নামাজ, রোজার সঙ্গে কল্যাণের তথা মানবিকতা ও নৈতিকতার গুণাবলি অর্জন করা জরুরি। এ সম্পর্কে এরশাদ হচ্ছে, ‘পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফেরানোতে কোনো পুণ্য নেই; কিন্তু পুণ্য আছে কেউ আল্লাহ, পরকাল, ফেরেশতা, সব কিতাব এবং নবীদের প্রতি ঈমান আনলে এবং আল্লাহর প্রেমে আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন, পর্যটক সাহায্য প্রার্থীদের এবং দাসমুক্তির জন্য অর্থদান করলে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করলে ও জাকাত প্রদান করলে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করলে, অর্থ সংকটে দুঃখ-ক্লেশে ও সংগ্রাম সংকটে ধৈর্য ধারণ করলে। এরাই তারা, যারা সত্যপরায়ণ এবং তারাই মুত্তাকি।’ (সূরা আল-বাকারা : ১৭৭)।
মানুষকে ভালোবাসলে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ পায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল নয় তার ওপর আল্লাহ তায়ালা কোনো অনুগ্রহ করবেন না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি মানুষকে ভালোবাসে না তাকে আল্লাহ তায়ালাও ভালোবাসে না। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, উদার ও দয়ালুদের প্রতি দয়াবান দয়া করে থাকেন। তোমরা পৃথিবীবাসীকে দয়া কর, ভালোবাস। আল্লাহ তোমাদের দয়া করবেন, ভালোবাসবেন। (তিরমিজি)। অন্য হাদিসে আছেÑ ‘মানুষের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি তিনি যিনি মানুষের কল্যাণ করেন।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সব মোমিন এক অখ- ব্যক্তির মতো। যদি কোনো ব্যক্তির চক্ষু ব্যথা হয় তবে তার সর্বাঙ্গ ব্যথিত হয়। যদি তার মাথায় ব্যথা হয় তখন সর্বাঙ্গ ব্যথিত হয়। (বোখারি ও মুসলিম)।
কোরআন ও হাদিস দ্বারা বোঝা যায়, আল্লাহর অনুগ্রহ পেতে হলে তার সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে ভালোবাসতে হবে। সুখে-দুঃখে পরস্পর পরস্পরের সমঅংশীদার হতে হবে, কারও অসুখের খবর পেলে তার সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু মানুষের অধিকারের কথা বলেই আল্লাহর নবী ক্ষান্ত হননি। তিনি এর সঙ্গে প্রাণী, জীববৈচিত্র্য ও বৃক্ষের অধিকার সংরক্ষণের কথাও বলেছেন। এরশাদ হচ্ছে, সব সৃষ্টি জগৎই হলো আল্লাহর পরিবার। এ পরিবারের সদস্যদের যে যত বেশি উপকার করবে সে তত বেশি আল্লাহর প্রিয়পাত্র হবে। (তিরমিজি শরিফ)। এ হাদিস দিয়ে বোঝা যায়, সব সৃষ্টিজীবই হলো আল্লাহর পরিবারের সদস্য। আর এসব সদস্যের মধ্যে মানুষ হলো শ্রেষ্ঠ। তাই মানুষের পাশাপাশি অন্য জীবদের অধিকারও সংরক্ষণের জন্য দয়াল নবী পার্থিব জগতে আল্লাহর করুণা লাভ ও পরকালে বেহেশত লাভের আশ্বাস দিয়েছেন।
তীব্র শীতের প্রকোপ নিদারুণ কষ্ট ও দুঃসহ অবস্থায় পড়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে দেশের অগণিত গরিব-দুঃখী মানুষ, ছিন্নমূল শিশু ও নারী। শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব থেকে রক্ষা পেতে প্রয়োজন সুচিকিৎসা ও ওষুধপথ্য এবং শীত মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি কার্যকর উদ্যোগ। জাতি-ধর্ম-বর্ণ, দলমত নির্বিশেষে বিত্তবানদের শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। নবী করিম (সা.) পরকালীন পুরস্কারপ্রাপ্তির কথা ঘোষণা করেছেনÑ ‘এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে কাপড় দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের পোশাক দান করবেন। ক্ষুধার্ত অবস্থায় খাদ্য দান করলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুস্বাদু ফলদান করবেন। কোনো মুসলমানকে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি পান করালে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সিলমোহরকৃত পাত্র থেকে পবিত্র পানি পান করাবেন।’ (আবু দাউদ)।
দুর্যোগময় মুহূর্তে আর্তমানবতার সেবায় সাহায্যের হাত বাড়ানো খাদ্য, ওষুধপথ্য, শীতবস্ত্র এবং গরম কাপড়, প্রয়োজনে জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বিপদগ্রস্তদের পাশে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আল্লাহ তায়ালা ধর্মপ্রাণ মানুষের ঈমানের দৃঢ়তা পরীক্ষা করেন, আর দেখেন বিপদগ্রস্ত অসহায়দের জন্য কারা সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়ান। যাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই তাদের দুরবস্থা সর্বাধিকÑ সে কথা বলাইবাহুল্য। হাড় কাঁপানো শীতে যে বিপুল জনগোষ্ঠী বর্ণনাতীত দুঃখ-কষ্টে দিন যাপন করে তাদের পাশে দাঁড়ানো ধর্মপ্রাণ মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। রাসুলে পাক (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মোমিনের পার্থিব একটি মসিবত দূর করবে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার মসিবতগুলো দূর করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো অভাবী মানুষকে সচ্ছল করে দেবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে ইহকাল ও পরকালে সচ্ছল করে দেবেন এবং আল্লাহপাক বান্দার সাহায্য করবেন যদি বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্য করে। (মুসলিম)।
সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, বিভিন্ন সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজ নিজ এলাকায় শীতার্ত, অসহায়, গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে বিতরণ করতে পারেন। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ায় মানুষকে খাদ্য দান করেছে, সেদিন (রোজ কেয়ামতের দিন) তাকে খাদ্য দান করা হবে। যে আল্লাহকে খুশি করার জন্য মানুষকে পানি পান করাবে, তাকে সেদিন পানি পান করিয়ে তার পিপাসা দূর করা হবে। যে মানুষকে বস্ত্র দান করবে, তাকে সেদিন বস্ত্র পরিধান করিয়ে তার লজ্জা নিবারণ করা হবে। সমাজের একজন মানুষ বিপদে পড়লে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করা বিত্তবান প্রতিবেশীর দায়িত্ব ও মানবিক কর্তব্য। সবার উচিত সৃষ্টির প্রতি দয়ামায়া, ভালোবাসা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও সহানুভূতি বজায় রাখা, দেশের ধনাঢ্য ও বিত্তবান মানুষের প্রতি আহ্বান, শীতের মৌসুমে সামর্থ্য অনুযায়ী গরিব-দুঃখী মানুষকে শীতবস্ত্র প্রদান করুন।

Related Articles