ইসলাম

মানব জাতির শীতকালের সুন্নত আমল

ইসলাম ডেস্ক :

মানব জাতির এ পার্থিব জীবনে অসংখ্য নিদর্শনের মাঝে একটি হলো ঋতুচক্র। গ্রীষ্মের বিপরীত শীত ঋতু; তেমনি শীতের বিপরীত গ্রীষ্ম। বর্ষা ঋতুর থৈ-থৈ জলরাশিকে স্থলভূমি চুষে নেয় হেমন্তের আগমনে।বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ হলেও পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই চারটি ঋতুতে বছর ঘোরে। আবার এ ঋতুচক্র পৃথিবীর একেক জায়গায় একেক রকম। যখন এশিয়া, আমেরিকা বা ইউরোপে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর জীবন বিপর্যস্ত হয় শীতের তীব্রতায়, তখন পৃথিবীর আরেক প্রান্তের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় চলছে গ্রীষ্ম ঋতু। কিছুদিন আগেও যে শিশুটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না, সে আজ জীবন্ত এবং পূর্ণ অস্তিত্বময় মানুষ আপনার-আমার জীবনে। আবার আজ যে মানুষটি ঘিরে আছে আপনার বাস্তবতায়, সে হয়তো আগামীকাল অস্তিত্বহীন এ ধরায়। জীবনচক্র এমনই, আপনাকে-আমাকে সবাইকে চলে যেতে হবে। আমাদের সঙ্গী হবে শুধু কর্মটুকু।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, ‘(আল্লাহ) আপনি রাতকে দিনের ভেতরে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতের ভেতরে প্রবেশ করিয়ে দেন। আর আপনিই জীবিতকে মৃতের ভেতর থেকে বের করে আনেন এবং মৃতকে জীবিতের ভেতর থেকে বের করেন। আর আপনি যাকে ইচ্ছা বেহিসাব রিজিক দান করেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ২৭)।ঘূর্ণায়মান পৃথিবীর ঋতুচক্রের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় আমরা যে সিস্টেম বা নিয়ম সম্পর্কে জানি তা তো আল্লাহ তায়ালারই বানানো নিয়ম। আর শৈত্যপ্রবাহ বা গ্রীষ্মের তাপদাহ, বসন্তের পুষ্প কানন অথবা ঝড়ের তা-ব, প্রকৃতির যে অবস্থার কথাই বলি না কেন, সবটাই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই আসে। হতে পারে তা মানুষের জন্য কল্যাণকর, নেকি অর্জনের পাথেয়, পরীক্ষা কিংবা হতে পারে ইহকাল ও পরকালের সংকট। তীব্র শীত বা তীব্র গরম হতে পারে মোমিনের জন্য পরীক্ষা। এ কালের আবর্তনকে একজন মোমিন নেন উত্তম আমল করার সুযোগ হিসেবে। শীতকালের দীর্ঘ রাতে একজন মোমিন যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়ে আবার তাহাজ্জুদ সালাত পড়া, তেলাওয়াত ও জিকির করার সময় পান, তেমনি শীতল আবহাওয়ার ছোট দিনের বেলা সিয়াম পালন করাও তার জন্যে হয়ে ওঠে সহজ। এ মর্মে হজরত ওমার (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসটি হলোÑ ‘শীতকাল ইবাদতকারীদের জন্য গনিমতস্বরূপ।’ তিরমিজি শরিফে আরেকটি হাদিস এসেছে, হজরত আমির ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শীতল গনিমত হলো শীতকালের রোজা।’ এছাড়া শীত উপলক্ষে আরও কিছু ইবাদত বা নেকি অর্জনের সুযোগ রয়েছে।আমাদের দেশের মহিলারা তাদের সংসারে অনেক কাজই করে থাকেন, কম বয়সী ছেলে-মেয়েরাও পরিবারের অনেক কাজে সাহায্য করে; কিন্তু সত্যি হলো তা আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং নেকির উদ্দেশে করা হয় না। শীতের সময়গুলোতে পরিবারের বয়সিদের গরম পানির ব্যবস্থা করা, অজু-গোসলে সাহায্য করা, ব্যথা-বেদনায় তাদের তেল মালিশ করে দেওয়া, রোজাদারের সাহরি-ইফতারি পরিবেশনসহ অনেক দায়িত্বমূলক কাজে মহিলারা অনেক সওয়াব অর্জন করে নিতে পারেন নেক নিয়ত, আন্তরিক প্রচেষ্টা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায়। মোমিন ব্যক্তির মন এমনিতেই দয়ামায়ায় ভরপুর থাকে। তারা পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রতি যেমন যতœশীল, তেমনি আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, মোমিন মুসলিম সবার প্রতি সেবার হাত বাড়িয়ে দেন। শীত মৌসুমে মোমিন পুরুষরা বৃদ্ধ, শিশু এবং অসুস্থদের প্রতি বিশেষ যতœসহ গরিব শীতার্তদের মাঝে গরম কাপড় দানসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় অভাব মেটানোর মাধ্যমে নেকি হাসিল করে নিতে পারেন। তেমনিভাবে অতিবৃষ্টি বা খরায় জনজীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ-দুর্দশা। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ে অনেকে হয়ে পড়েন গৃহহীন, বিশুদ্ধ পানির অভাব, ফসল-ফলাদি নষ্ট হয়, খরায় ফসল হয় না, আর দেখা দেয় খাদ্যাভাব, পানি সংকটে নগর জীবন হয়ে ওঠে কষ্টকর। বিশুদ্ধ পানিবিহীন এলাকাগুলোতে দেখা দেয় নানা রকম অসুখ-বিসুখ। সে সবসময় সামর্থ্যবান মোমিনরা অসহায়দের খাদ্য, পানি এবং অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে পেতে পারেন মানুষের দোয়া, অর্জন করতে পারেন মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি। আবার গ্রীষ্মের প্রচ- তাপদাহে রাস্তাঘাটে মানুষের নাভিশ্বাস ওঠে, এ সময় তৃষ্ণার্তকে পানি পান করানো খুবই নেকির কাজ। এ সময় অনেক জায়গায় দেখা দেয় পানি সংকট, সেসব জায়গায় পানি সরবরাহ করা যেতে পারে। মোমিনরা এটাকে নেকি অর্জনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে, আছে কোরআনের বাণীও। তিরমিজি এবং আহমদ গ্রন্থে যেমন বলা হয়েছেÑ আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দয়াশীলদের ওপর করুণাময় আল্লাহ দয়া করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীকে দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের দয়া করবেন।’ আমাদের দেশে বিভিন্ন ঋতুতে মোমিনরা আমলের ক্ষেত্রে অনেক সময় কিছু গাফিলতি বা অনেক ক্ষেত্রে গোনাহ করে বসেন। শীতের সময় যে ব্যাপারটি বেশি ঘটে তা হলো পবিত্রতা অর্জনে ত্রুটি। যেমন, অসুস্থতার অজুহাতে ঠিকভাবে অজু-গোসল না করা, মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাতে সালাত আদায় না করা ইত্যাদি। তেমনি বর্ষা অথবা গরমের সময় নানা রকম অজুহাত বের করে যথাযথভাবে আমল না করা। মহান আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝে তার হেদায়েতের পথে পরিপূর্ণভাবে নেক আমল করে জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন।

Related Articles