সম্পাদকীয়

মেধার বিকাশ ও শিক্ষার হার

মোহাম্মদ নজাবত আলী :

আজকাল সাটিির্ফকেট অজর্নই প্রায় সবার লক্ষ্য। মেধা সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটুক সেদিকে খেয়াল নেই। সবাই ছুটছে কোচিং সেন্টারের দিকে। সহজে পাস ও সবচেয়ে কমপড়ার জন্য এসব অবলম্বন। এ জন্য শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে প্রাইভেট কোচিং স্টোরের মাধ্যমে শিক্ষালাভে তৎপর। বিদ্যা যেখানে অথের্র বিনিময়ে বেচাকেনা হয়, সেখানে মেধার বিকাশ বা শিক্ষার মান বড় কথা নয়, সাটিির্ফকেট অজর্নই মুখ্য। যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষাথীর্ পাস করেছে এবং তাদের মধ্যে অনেকে ভালো ফল অজর্ন করেছে। কিন্তু কতজন শিক্ষাথীর্র প্রকৃত মেধার বিকাশ ঘটেছে এ প্রশ্ন অস্বাভাবিক, অপ্রাসঙ্গিক বা অবাস্তব নয়। আমার এ মতের সঙ্গে অনেকের দ্বিমতও থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়, এটা আমাদের মেনে নিতেই হবে। প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে মন মস্তিষ্ক ও অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞান অজর্ন করা। বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটানো। সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও তাই। বতর্মান সৃজনশীল পরীক্ষা বা শিক্ষা পদ্ধতির মূল দিকই হচ্ছে মুখস্থ বিদ্যা পরিহার করে একজন শিক্ষাথীর্ নিজের মেধা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বুঝে প্রশ্নের উত্তর সুন্দরভাবে তৈরি করে পরীক্ষার খাতায় সাজিয়ে লিখা। কিন্তু শিক্ষাথীর্রা বিদ্যালয়মুখী না হয়ে প্রাইভেট কোচিং, নোট গাইডমুখী হচ্ছে। এতে দেখা যাচ্ছে ভালো ফল অজর্ন করা জিপিএ-৫ বা গোল্ডেন প্লাস শিক্ষাথীর্র পড়ার টেবিলে বিভিন্ন নোট গাইড। আমার বিশ্বাস এতে শিক্ষাথীর্র মেধার বিকাশ সৃজনশীলতা তৈরিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সৃজনশীল শব্দের অথর্ হচ্ছে সৃষ্টিশীল। একজন শিক্ষাথীর্র মাঝে সৃষ্টিশীলতা তৈরি মানেই সৃজনশীলতা। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাথীর্রা প্রাইভেট, কোচিং, নোট গাইডের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে না এলে মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটবে না। আবার পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে মৌখিকভাবে নিদের্শনা দেয়া হয় যাতে করে কোনো শিক্ষাথীর্ ফেল না করে। এ কারণেই পাসের হারও বাড়ছে বলে অনেকে মনে করেন। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু ত্রæটি-বিচ্যুতির মাঝেও যথাসময়ে পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও শিক্ষাথীের্দর হাতে নতুন বই তুলে দেয়া বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। প্রতিবছর ১ জানুয়ারি সারাদেশে পাঠ্যবই উৎসব পালিত হয়ে আসছে। সে সূত্র ধরেই ইতোমধ্যে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বই বিতরণ করা হয়েছে। নতুন বছরে নতুন আশা উদ্দীপনা, স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষাথীর্রা নানা রং বে-রংয়ের নতুন বই হাতে পেয়ে তাদের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে প্রতিবছর ১ জানুয়ারিতে যে শিক্ষাথীর্র হাতে বই তুলে দেয়া হয় সেটা সরকারের একটি মহতী উদ্যোগ এতে কোনো সন্দেহ নেই। নতুন বছরে নতুন শ্রেণিতে উত্তীণর্ শিক্ষাথীর্রা নতুন বইয়ের সেদোগন্ধে আনন্দে আত্মহারা। তাদের উচ্ছ¡াস ও আনন্দ দেখে মনে হয় এরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে তাদের মেধায় দেশ এগিয়ে যাবে ও আলোকিত সমাজ গড়ে উঠবে। যা হোক আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য কি? দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষাথীের্দর কিভাবে মেধার বিকাল ঘটানো যায়। কিভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো যায়; একটি দক্ষ ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন করা যায়। এ চিন্তা-ভাবনা থেকে পুরাতন সিলেবাসের সনাতন পদ্ধতির মুখস্থ বিদ্যা পরিহার করে শিক্ষাথীর্র পাঠে মনোযোগী দক্ষতা বাড়ানো ও সৃজনশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন আমাদের দেশের শিক্ষাবিদ বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞজনরা। বতর্মানে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ, ঢেলে সাজানো বা স¤প্রসারণ করা হলেও শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে দেশের বিভিন্ন মহলে। শতভাগ পাস দেখে আমরা মনে মনে খুব আনন্দিত হই। ভাবি, দেশ শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছেÑ উন্নত হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা শিক্ষার হার ও মেধার বিকাশকে এক করে ফেলিÑ যা মোটেই ঠিক নয়। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম রয়েছে। সিলেবাসের বোঝা, নোট গাইড, কোচিং বাণিজ্য, খাতা অবমূল্যায়ন, প্রশ্নপত্র ফঁাস ইত্যাদি। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, একটি পাঠ্য পুস্তককে হজম করতে অপাঠ্য পুস্তকের দরকার হয়। কিন্তু আমাদের কোমলমতি শিক্ষাথীর্রা সিলেবাস শেষ করা, কোচিং প্রাইভেটের চাপে একেবারে নাজেহাল অপাঠ্য বই পড়ার সময় কোথায়? সরকার যে প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থগারিক পদ সৃষ্টি করে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে এবং হাজার হাজার বই সংরক্ষণ করা হয়েছেÑ সে বইগুলো কাদের জন্য, কে পড়বে? শিক্ষাথীর্রা তো পড়ার সুযোগ পাবে না। তাহলে তাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পাবে কীভাবে? এ প্রসঙ্গে বাংলাসাহিত্যের বিদগ্ধ লেখক ও মননশীল সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার প্রধান অঙ্গ হচ্ছে সাহিত্য চচার্, সাহিত্য চচার্ ব্যতিরেখে কোনো শিক্ষাথীর্ মেধাসম্পন্ন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। সুশিক্ষিত লোক মাত্রই স্বশিক্ষিত। শিক্ষাথীর্রা নিজের মনের রুচি হিসেবে বই পড়ে সুশিক্ষিত হবে। কিন্তু প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় সে সুযোগ নেই। পরীক্ষার চাপ, সিলেবাসের বোঝা টানতেই তাদের জীবন যায় যায় অবস্থা। একটি দেশের বড় সম্পদ হলো জনগোষ্ঠী। আবার এ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য ক্ষতির কারণ বা বোঝা হতে পারে যদি না তাদের যোগ্য, দক্ষ, মানবসম্পদে পরিণত করা না যায়। একটি দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে আধুনিক যুগোপযোগী শিক্ষার মাধ্যমে যদি প্রকৃতপক্ষে গড়ে তোলা যায় তাহলে দেশের জন্য সবার জন্য ভালো। আর মানসম্মত, শিক্ষাই পারে দেশকে সাবির্ক দিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এ কারণে প্রতিটি দেশ যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করে থাকে। সমাজ ও যুগের চাহিদা এবং সমকালীন জ্ঞানের যে বিস্তার ঘটেছে তার দিকে লক্ষ্য রেখে আমাদের দেশেও একটি শিক্ষানীতি চালু করে। এ শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে যেন সবোর্ত্তম ফল লাভ করা যায়। সে জন্য শিক্ষা নিয়ে গবেষণা বা ভাবনার শেষ নেই। যুগে যুগে প্রতিটি দেশে জ্ঞানী গুণী মনীষীদের ভাবনায় শিক্ষাই প্রাধান্য পেয়েছে। তাই এক সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিবতর্ন, বিয়োজন ও নিত্যনতুন প্রদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষাকে অথর্বহ করা হয়েছে। বতর্মান শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হচ্ছে যুগের চাহিদা অনুযায়ী বিপুলসংখ্যক শিক্ষাথীের্দর মেধার বিকাশ ঘটিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা। একটি জাতিকে কিভাবে সুশিক্ষায় সুশিক্ষিত করা যায়; কিভাবে শিক্ষার মানোন্নয়ন করা যায়; একটি দক্ষ ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠন করা যায় এ নিয়ে শিক্ষাবিদদের ভাবনার শেষ নেই। তাই বতর্মান সরকার একটি নতুন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করেছেন। আমরা সবাই জানি যে, একটি জাতির সাবির্ক উন্নয়নে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষায় প্রায় শতভাগ শিক্ষাথীর্ পাস করছে। পাসের হারের দিক থেকে দেশ এগিয়ে গেলেও শিক্ষার মান বাড়ছে কি না এ নিয়ে শিক্ষাবিদ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বিশিষ্টজনদের মধ্যে মতপাথর্ক্য রয়েছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, এখন শিক্ষার মান বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ পাস করা ও শিক্ষিত হওয়া এক বস্তু নয়। তবুও শিক্ষায় দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যে যা-ই বলুন না কেন, আমাদের শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। শত ভাগ পাসের সঙ্গে শিক্ষার মান কিভাবে বাড়ানো যায় সেটাই সংশ্লিষ্ট সবার বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে পিএসসি, জেএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। বরাবরের মতো এবারেও পরীক্ষার ফল সন্তোষজনক। শিক্ষাথীর্রা নতুন বইও পেয়েছে।যা হোক,শিক্ষা ক্ষেত্রে যা কিছু অনিয়ম রয়েছে তা দূর করতে হবে। আমরা যে বিশ্বমানের শিক্ষার কথা বলছি, তা অজের্ন শতভাগ পাসের সঙ্গে শিক্ষার মান বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। লাখো শিক্ষাথীর্র মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটিয়ে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবেÑ যাতে করে দেশের কল্যাণে সমৃদ্ধ জাতি গঠনে ভ‚মিকা রাখতে পারে। যারা পাস করেছে এবং যারা করতে পারেনি সবার জন্য রইল শুভেচ্ছা।

Related Articles