ইসলাম

যে দুনিয়ার সঙ্গে শক্তভাবে জড়িয়ে পড়বে সে প্রতারিত হবে

ড. শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান হুজায়ফি

পৃথিবীর সীমিত আয়ুষ্কাল। এর তুচ্ছ সৌন্দর্য ও ক্ষণে ক্ষণে এর বিশাল পালাবদলের অবস্থা নিয়ে চিন্তা করুন। তাহলে পৃথিবীর মূল্য বুঝতে পারবেন। এর প্রকৃত মর্ম জানতে পারবেন। যে ব্যক্তি দুনিয়ার সঙ্গে শক্তভাবে জড়িয়ে পড়বে সে প্রতারিত হবে। যে এর প্রতি আসক্ত হবে সে ধ্বংস হবে। মানুষের আয়ুর সীমাবদ্ধতা অনুপাতে দুনিয়ার মেয়াদের সীমাবদ্ধতা হয়ে থাকে। ব্যক্তির জীবন শুরু হয় কয়েক ঘণ্টা দিয়ে। ঘণ্টার পরে আসে দিন, দিনের পরে মাস, মাসের পরে বছর। কয়েক বছর পর মানুষের আয়ুষ্কাল একেবারে শেষ হয়ে যায়। সে জানে না তার মৃত্যুর পর কী কী বড় বড় ঘটনা ঘটবে।
হে মানব, তোমার পরবর্তী যারা আছে তাদের আয়ু কি তোমার আয়ু? বিভিন্ন প্রজন্ম ও যুগে সৃষ্টির আয়ু তো একটা মুহূর্ত মাত্র। দুনিয়া তো বরং এক সাময়িক আমোদ। যে আমোদ-প্রমোদ একটা নির্দিষ্ট সময়ে আস্বাদন ও ভোগ করা যায়। আর সে সময়টা তো শেষও হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় এ দুনিয়া শুধু একটি আমোদের সামগ্রী আর আখেরাতই হচ্ছে স্থায়ী আবাস।’ (সূরা গাফির : ৩৯)। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি তাদের জন্য পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত প্রদান করুন তা সেই পানির মতো যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করেছি, অতঃপর তার সঙ্গে জমিনের উদ্ভিদের মিশ্রণ ঘটেছে, পরে সেটা শুকনো খড়ে পরিণত হয়েছে, বাতাস তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান।’ (সূরা কাহফ : ৪৫)। তিনি আরও বলেন, ‘আপনি কি লক্ষ্য করেছেন আমি তাদের কয়েক বছর ভোগের সুযোগ করে দিয়েছি, তারপর তাদের কাছে তা এসে পড়েছে যেটার প্রতিশ্রুতি তাদের দেওয়া হতো। তাদের প্রদত্ত ভোগের সামগ্রী তাদের কোনো কাজে লাগেনি।’ (সূরা শুআরা : ২০৫-২০৭)।
আমাদের পালনকর্তা আমাদের জানিয়েছেন যে, মানুষের হিসাবের জন্য পুনরুত্থান পর্যন্ত কবরে অবস্থানের সময়টা অতি সংক্ষিপ্ত, এ দীর্ঘ সময়টা একটি ঘণ্টার মতো। আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন তিনি তাদের সমবেত করবেন সেদিন মনে হবে যেন তারা শুধু দিনের একটি ঘণ্টাই অবস্থান করেছে, যে সময়টুকুতে তারা পরস্পর পরিচিত হতে পারে মাত্র।’ (সূরা ইউনুস : ৪৫)। তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন কেয়ামত হবে সেদিন অপরাধীরা কসম করে বলবে, তারা শুধু একটি ঘণ্টা অবস্থান করেছে।’ (সূরা রুম : ৫৫)। তাহলে হে মানব, এ সময়টুকুর মাঝে যেটাকে আল্লাহ কেয়ামত ঘটার সময় দুনিয়ার সময়ের মতো বলে আখ্যায়িত করেছেন, তোমার জীবন কতটুকুই আর? দুনিয়ার সময়ের মতো এ সময়টুকু তো মাত্র চিরস্থায়ী অসীম সময়ের মহাসমুদ্রে একটি ফোঁটা মাত্র।যে ব্যক্তি তার সংক্ষিপ্ত জীবনে সৎকর্ম করেছে, হারাম কাজ বর্জন করেছে, প্রবৃত্তি, ভ্রান্তি ও বিপথগামিতার অনুসরণ থেকে বিরত থেকেছে তার জন্য সৌভাগ্য ও শুভ সংবাদ। সে দুনিয়ায় প্রভূত কল্যাণকর বিষয় নিয়ে সফল হয়েছে, মৃত্যুর পরে জান্নাতের সুখময় পরিবেশে আল্লাহর সন্তুষ্টি পেয়ে জয়ী হবে। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তির অনুসরণ করেছে, নামাজ ও করণীয় বিষয়গুলো নষ্ট করেছে এবং বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়েছে তার জন্য রয়েছে দুর্গতি। সে জাহান্নামের অতলে পতিত হয়েছে, তার খাবার হবে জাক্কুম, পানীয় হবে পুঁজ ও উত্তপ্ত পানি।যার সুস্থতা তাকে সীমালঙ্ঘনের দিকে নিয়ে গেছে, ফলে সে অবাধ্য হয়েছে, যার অবসর তাকে নষ্ট করে ফেলেছে, ফলে সে অহেতুক কাজে মগ্ন হয়েছে, যার সম্পদ তাকে বিভ্রান্ত করেছে, ফলে সে ধ্বংস হয়েছে, যে তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে অধঃপতিত হয়েছে, পথহারা হয়েছে, যার যৌবন তাকে ধোঁকায় ফেলেছে, ফলে সে উদ্ধত ও সীমা লঙ্ঘনকারী হয়েছে, তাকে বলছি শুনো, তুমি কি জানো না যে, আসমানে ও জমিনে কোনো কিছুই আল্লাহকে পরাভূত করতে পারে না, আর তিনি কঠোর শাস্তিদাতা? তুমি কি মৃত্যু ও তার পরবর্তী হিসাবের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর না? যাকে মৃত্যু-পূর্ববর্তী অবকাশ ও আশা পূরণের সুযোগ তার রবের বিপক্ষে স্পর্ধা করতে বাধ্য করেছে, এমনকি হঠাৎ মৃত্যু এসে তাকে ছিনিয়ে নিয়েছে, সে কেমন করে দুনিয়ায় ফিরে এসে তার আমল ঠিক করবে?হে উদাসীন অবাধ্য কর্মবিমুখ মানব, তোমার কি এখনও তোমার রবের দিকে ফিরে আসার ও তওবা করার সময় হয়নি? এখনও কি তোমার এই চরম উদাসীনতা থেকে জেগে ওঠার ও সাড়াদান করার সময় আসেনি? তুমি কি পূর্ববর্তী শক্তিশালী জাতিগুলো যারা নানা প্রজাতির গাছপালা লাগিয়েছিল, নদ-নদী প্রবাহিত করেছিল, শহর-নগর প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাদের অবস্থা ও তাদের বিলুপ্ত ঘরবাড়ি দেখে উপদেশ গ্রহণ করবে না? তারা অস্তিত্বশীল থাকার পর কীভাবে প্রতেœ পরিণত হলো? গৌরবের পরে গল্পে পরিণত হলো? প্রাসাদ থেকে কীভাবে সমাধিতে স্থানান্তরিত হলো? কীভাবে তারা কর্মফলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল? সৎকর্মশীলরা হবে বিজয়ী সফল আর অসৎকর্মশীলরা হবে ক্ষতিগ্রস্ত অনুতপ্ত। মৃত্যুকে কি কেউ ফেরাতে পারবে? কোরআন ছাড়া কি কোনো পথপ্রদর্শনকারী আছে? দিন ও বছরের আগমনে, দিন ও বছরের অবসানে অনেক শিক্ষা ও উপদেশ নিহিত আছে। একেকটি অতিবাহিত দিন কখনও ফিরে আসে না। একেকটি দিনকে স্বাগত জানাতে জানাতে আয়ু শেষ হয়ে যায়, আশা নিভে যায়। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের জন্য শুধু তাই রয়েছে যার সে চেষ্টা করেছে, তার প্রচেষ্টা অচিরেই দৃশ্যমান হবে, তারপর তার পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে, আর তোমার রবের দিকেই অন্তিম গন্তব্য।’ (সূরা নাজম : ৩৯-৪২)।তাই চিরস্থায়ী আবাসের জন্য আমল করুন, যার সুখ-শান্তি কখনও ধ্বংস হবে না ও হ্রাস পাবে না, বরং বৃদ্ধি পাবে। সেখানের অধিবাসীদের যৌবনে বার্ধক্য আসবে না। তারা রোগ-ব্যাধির আশঙ্কা করবে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নিরাপদে এখানে প্রবেশ করো। সেটা অমরত্বের দিবস। সেখানে তারা যা চাইবে তাই পাবে। আমার কাছে আরও অতিরিক্ত অনেক কিছু আছে।’ (সূরা কাফ : ৩৪-৩৫)। আল্লাহর অবধারিত নির্দেশ পালন করে ও তাঁর ভীষণ ক্রোধ থেকে বেঁচে থেকে তোমরা ওই আগুনকে ভয় করো, যার শাস্তি কিছুতেই বন্ধ হবে না।নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের জন্য সৎকর্ম সম্পাদন ও মন্দকর্ম বর্জনের বিধান দিয়ে রহমতের দ্বারসমূহ খুলে দিয়েছেন। তাই কেউ যেন গোনাহ ও অবাধ্যতা করে আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে নিজের জন্য সে রহমতের দ্বার বন্ধ করে না দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আমার রহমত সব কিছু ব্যাপ্ত করে আছে। আমি সেটা তাদের জন্য বরাদ্দ করে রেখেছি যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত প্রদান করে এবং যারা আমার আয়াতগুলোর প্রতি ঈমান আনে।’ (সূরা আরাফ : ১৫৬)।সুস্থতার সময়কে কাজে লাগান। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘দুটি নেয়ামতের ক্ষেত্রে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়ে থাকে : সুস্থতা ও অবসর।’ (বোখারি)। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তুমি পৃথিবীতে এমন করে থাক যেন তুমি প্রবাসী কিংবা পথিক।’
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলতেন, ‘সন্ধ্যা হলে সকালের অপেক্ষা করো না, সকাল হলে সন্ধ্যার অপেক্ষা করো না। তোমার সুস্থতার সময় থেকে তোমার রুগ্ণতার সময়ের পাথেয় নিয়ে নাও। তোমার জীবন থেকে তোমার মৃত্যুর পাথেয় গ্রহণ করো।

Related Articles