ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে হঠাৎ ঝড়

ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে হঠাৎ ঝড়

১৮ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে দেখলাম রাজধানীর বিভিন্ন স্পটে ৬০টি ক্যাসিনো রয়েছে। এছাড়া অলিতেগলিতে নাকি ছোট আকারে অনেক ক্যাসিনো আছে। এসব ক্যাসিনোয় অবৈধ ব্যবসাসহ হাউজি খেলা ও নারীসম্ভোগের ব্যবস্থাও রয়েছে। এগুলো পরিচালনার জন্য নেপাল, থাইল্যান্ডসহ চারটি দেশ থেকে প্রশিক্ষিত নারীদের আনা হয়েছে। ক্যাসিনোগুলোতে প্রতি রাতেই কোটি কোটি টাকার খেলা হয়। এসব নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতারা। রাত যত বাড়তে থাকে, ততই এসব ক্যাসিনো জমে ওঠে। ভিড় করতে থাকেন প্রভাবশালীরা, আর তাদের সঙ্গে থাকেন উঠতি বয়সের নায়িকা এবং মডেলরা। উন্নত বিশ্ব, পর্যটন সিটি ও মাদকের সিটিগুলোর কালচার হচ্ছে ক্যাসিনো। আমাদের যানজটের শহর, ঘনবসতির শহর এবং পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধা দিয়ে বসবাসের অযোগ্য শহরে ক্যাসিনো! দেশ কি তাহলে উন্নত হচ্ছে! নাকি অন্য কিছু? যেমন আফ্রিকার অনেক দেশে মানুষের পেটে খাবার নেই, গায়ে জামা নেই অথচ রাতভর ক্যাসিনো থাকে সরগরম। সকালে পত্রিকার পাতায় খবর দেখার পর সন্ধ্যায় টেলিভিশনে দেখলাম ক্যাসিনো সাম্রাজ্যে হানা দিয়েছে র‌্যাব। সবই যেন হঠাৎ হঠাৎ হয়ে গেল। আর তাই তো যুবলীগ চেয়ারম্যান দেখলাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলছেন হঠাৎ কেন? আপনারা এতদিন কি আঙুল চুষছিলেন?
পরে ১৯ তারিখ পত্রিকা পড়ে জানতে পারলাম দুই দিন আগে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, ‘যুবলীগ ঢাকা মহানগরের এক নেতা যা ইচ্ছে তা করে বেড়াচ্ছেন, চাঁদাবজি করছেন। আরেকজন দিনের বেলায় প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে চলেন। যারা অস্ত্রবাজি করেন, ক্যাডার পোষেণ তারা সাবধান হয়ে যান। তা না হলে যেভাবে জঙ্গি দমন করা হয়েছে, একইভাবে তাদেরও দমন করা হবে।’ মূলত দল ও অঙ্গ সংগঠনের ভেতর থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দেওয়ার পরই রাজধানীতে র‌্যাবের অভিযান শুরু হয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর বিকালে প্রথমেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁঁইয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাধারণ কর্মী থেকে এ খালেদ হয়ে উঠেছিলেন অপকর্মের গডফাদার। রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে আধিপত্য ছিল তার। তার বাড়ি থেকে তিনটি অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রায় একই সময় ফকিরাপুল এলাকায় খালেদের নিয়ন্ত্রিত ইয়ংমেনস ক্লাবে চালানো ক্যাসিনোয় অভিযান চলে। সেখান থেকে ১৪২ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- দেওয়া হয়। রাতে আরও তিনটি ক্লাব কাম ক্যাসিনোয় অভিযান চালানো হয়। অভিযান চালানো হয় ‘গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ’ ওয়ান্ডারার্স ক্লাবসহ কয়েকটি ক্যাসিনোয়। ক্যাসিনোগুলো থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নগদ টাকা, ক্যাসিনো সামগ্রী, কষ্টিপাথরের মূর্তি। রাজধানীর মতিঝিল, ফকিরাপুল এলাকার কমপক্ষে ১৭টি ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ নেতা খালেদ। এর মধ্যে ১৬টি ক্লাব নিজের লোকজন দিয়ে আর ফকিরাপুল ইয়ংমেনস নামের ক্লাবটি সরাসরি তিনি পরিচালান করেন। প্রতিটি ক্লাব থেকে প্রতি রাতে কমপক্ষে এক লাখ টাকা করে নেন। লেগুনা ও গণপরিবহন থেকে টাকা নেন। শাহজাহানপুর কলোনি মাঠ, মেরাদিয়া ও কমলাপুর পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ করে পান লাখ লাখ টাকা। প্রতি মাসে ১ কোটি টাকার বেশি নেন শাহজাহানপুর রেললাইনসংলগ্ন মাছের বাজার থেকে। এসব কিছুর বলি সাধারণ জনগণ। তাদের চাঁদা দিতে হয় সর্বত্র। নিজের দেশে উৎপাদিত যেসব পণ্য মানুষ কিনতে পারে পাঁচ টাকায়, সেই পণ্যই কিনতে হয় পঁচিশ-ত্রিশ টাকায়। কারণ চাঁদা দিতে হয় বিভিন্ন স্তরে, বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্নভাবে। কেউ পিছিয়ে নেই চাঁদা তোলায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পাতি মাস্তান, ছাত্রনেতা থেকে বড় বড় নেতা পর্যন্ত। এত চাঁদা যদি জনগণকে দিতে হয়, তাহলে জিনিসপত্রের দাম তো বাড়বেই। জনগণ কাকে জানাবে এ ফরিয়াদ? তারা শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু সরকার যারা পরিচালনা করেন তারা কেন এসব দুর্ধর্ষ মানুষকে পার্টিতে জায়গা দেন, শুধু জায়গা দেওয়া নয়, বড় বড় পদ দেওয়া, সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়াÑ এসব আমাদের বুঝে আসে না। অবশ্য আমাদের মতো মানুষের এগুলো বোঝার কথাও নয়। শুধু এতটুকু বুঝলাম যে, এদের ছাড়া বোধহয় রাজনীতি চলে না।
বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটি ক্লাবের কমিটিতে যুবলীগের কয়েকজন নেতা অন্তর্ভুক্ত হন। এরপর তাদের প্রভাব বাড়তেই থাকে। ক্লাবে নিয়মিত মদ্যপানের আসর বসানোর পাশাপাশি হাউজি খেলা চালু করেন। এরপর বসে জুয়ার আসর। সেগুনবাগিচার আটটি স্থানেও যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতার তত্ত্বাবধানে ক্যাসিনো ব্যবসা চলে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বহুতল ভবনের ছাদ দখলে নিয়ে ক্যাসিনো চালানো হয়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রেীয় ছয় নেতাসহ অনেকেই আনাগোনা করেন এসব ক্যাসিনোতে। বড় ৬০টি ক্যাসিনোয় প্রতিটিতে গড়ে প্রতিদিন ২ কোটি টাকা করে ১২০ কোটি টাকার খেলা হয়। এ টাকার একটি বড় অংশ হুন্ডির মাধ্যমে চলে যায় বিদেশে। শেয়ারবাজার খালি, ব্যাংক খালি, সাধারণ মানুষ নিরাপদ ভেবে কিছু অর্থ রেখে দেয় কিছু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে, ডিবিএল, পিপলস লিজিং নামক কিছু প্রতিষ্ঠানে। সেখান থেকে কিছু ইন্টারেস্ট আসবে, তা দিয়ে সংসার চলবে। অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী এ আশায় এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ জমা রেখে পথে বসেছেন। কোথায় গেছে টাকা কেউ জানে না। সেগুলো খালি হয়ে গেছে। পথে বসেছেন অনেকে। অথচ বড় বড় নেতা লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এভাবে, আর তা পাচার করছেন বিদেশে। হায়রে অভাগা দেশ!
একজন মানুষের কত টাকা প্রয়োজন? ৬০, ৭০ কিংবা ৮০ বছরের এ জীবনে কত টাকার প্রয়োজন? এই সুন্দর দেশ, এই সোনার দেশের প্রায় সব মানুষই তো খেয়েপরে শান্তিতে থাকতে পারে। কিন্তু পুরো দেশটাকে তো জাহান্নাম বানায় এসব লোকজনই। যুবলীগ নেতা খালেদ এভাবে চাঁদা তুলতেন সর্বত্র। যদি কেউ চাঁদা দিতে রাজি না হতো তাদের ওপর চালাতেন নির্মম নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য তিনি তৈরি করেছেন ‘টর্চার সেল’। র‌্যাবের অভিযানে টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করা হয় শক দেওয়ার অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, গায়ের চামড়া জ্বলে-জ্বালাপোড়া করে এমন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিপুল পরিমাণ লাঠি ও হকিস্টিক। যেন মগের মুল্লুকের চেয়েও অন্য কিছু। এদেশের মানুষ স্বাধীনতার ফল ভোগ করবেÑ না, তা হতে দেবে না এরা। পাকিস্তানি হায়েনাদের চেয়েও নিজ দেশে তৈরি হয়েছে এসব ডন, মাফিয়া আর শয়তানের ভ্রাতা। ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে এতবড় সাহসী একটি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য।
সাধারণ মানুষ তো কোথাও স্বস্তি পাচ্ছে না। কারণে-অকারণে, যেখানে-সেখানে, যখন-তখন সহ্য করতে হয় পুলিশের অত্যাচার। মিডিয়ায় দেখলাম ঢাকার নতুন পুলিশ কমিশনার ডিসিদের বলেছেন দিনে দুই ঘণ্টা করে থানায় কাটাতে, যাতে সাধারণ মানুষ সেবা পায়। আসলে কোনো সাধারণ মানুষ কি থানায় সেবা নিতে যায়? মানুষ যদি কঠিন বিপদে পড়ে সেই বিপদকে বাধ্য হয়ে আরও বাড়ানো জন্যই তারা থানায় যায়। মানুষ যাবে কোথায়? জনগণের যারা প্রতিনিধি তারাও আবার জনগণের জন্য এত চমৎকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন! টর্চার সেল! মিডিয়া এসব তুলে না আনলে দেশের মানুষ কখনও এসব জানতে পারত না। ধন্যবাদ মিডিয়াকে।
জনগণের জন্য অন্তত কাউকে না কাউকে তো কাজ করতে হবে। জনগণ বাধ্য হয়েই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন, যাতে তারা দেশটাকে ভালোভাবে পরিচালিত করেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে এ রকম উপহার যখন আসে, তখন জনগণ একমাত্র স্রষ্টা ছাড়া আর কার কাছে জানাবে তাদের করুণ আর্তনাদ! এসব নেতাই দিনে হাজারবার বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নিয়ে এসব অপবিত্র কাজ করে যাচ্ছেন দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। নীল সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন। এদের রাজনীতিতে কি খুবই প্রয়োজন?

শেয়ার করুন