আজ শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৫৮ অপরাহ্


ভালোবাসুন অটিস্টিক শিশুদের

ভালোবাসুন অটিস্টিক শিশুদের

মকবুল হামিদ

আমাদের দেশের অনেক শিশু অটিজমে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী জীবনযাপন করছে। সমাজের দিকে তাকালে আমরা অনেক প্রতিবন্ধী লোক দেখতে পাই। তাদের মধ্যে কেউ মানসিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী, কেউ শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, আবার কেউ আত্মমগ্ন প্রতিবন্ধী। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের অটিস্টিক শিশু বলা হয়। আমরা হয়তো অনেকে অটিজমের নাম শুনেছি; কিন্তু অটিজম কী, কী কারণে অটিজম হয়, তা এখনও জানি না। অটিজম একটি মানসিক বিকাশঘটিত সমস্যা, যা স্নায়ু বা স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও পরিবর্ধনজনিত অস্বাভাবিকতার ফলে হয়। সাধারণত ১৮ মাস থেকে ৩ বছর সময়ের মধ্যেই এ রোগের লক্ষণগুলো দেখা যায়। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে সমস্যা হয়। অটিজমের কারণে কথাবার্তা, অঙ্গভঙ্গি, আচরণ একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকে, আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মানসিক ও ভাষার ওপর দক্ষতা কম থাকে।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের সহজে শনাক্ত করা যায়। বেশ কয়েকটি লক্ষণ দেখলেই বোঝা যায়, কোন শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। নিম্নোক্ত কয়েকটি কারণ হলোÑ অটিস্টিক শিশুরা সামাজিকভাবে মেলামেশা করতে চায় না। মনে রাখতে হবে, কম কথা বললেই কিন্তু অটিস্টিক শিশু হওয়া নয়। তার সঙ্গে অন্যান্য আচরণ, সামাজিকতা, অন্য একটি শিশুর সঙ্গে বা বয়স্ক মানুষের সঙ্গে মেশার বিষয়ে গ-গোল থাকলে ধরে নিতে হবে সে শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত। খেলার সময় সহপাঠীরা ডাকলে সে খেলতে আসে না। ক্লাসের মধ্যে সর্বদা নীরব থাকে। ক্লাসে কারও সঙ্গে মেশে না। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা কথা বলতে পারে, আবার না-ও বলতে পারে। যদিও কথা বলে পুরোপুরি গুছিয়ে বলতে পারে না। তাদের ঘুম কম হয়। ঘুম স্বাভাবিকভাবে না হওয়ার কারণে তাদের মনোযোগ ও কাজের ক্ষমতা কমে যায়, আচার-আচরণে সেটা পরিষ্কার টের পাওয়া যায়। অনেক শিশুর সঠিক সময়ে কথা বলতে সমস্যা হয়। তাদের বুদ্ধিও কম থাকে। অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশু দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ ও স্পর্শের প্রতি অতি সংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াহীন। সাধারণত তাদের প্রতি চারজনের মধ্যে একজনের খিঁচুনি সমস্যা থাকতে পারে। তাদের মানসিক অস্থিরতার ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া শিশুদের বিষণœতা, উদ্বিগ্নতা ও মনোযোগের ঘাটতি থাকে। তাদের হজম শক্তি কম থাকে। পেট ব্যথা, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে গ্যাস ও বমি ইত্যাদি হতে পারে। অটিস্টিক শিশুরা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হয়। স্বাভাবিক একটি শিশু বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় মা-বাবা ও পরবর্তী সময়ে অন্যদের সঙ্গে যেভাবে সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করে অটিস্টিক শিশুরা তা করতে পারে না। তারা শিশুকালে মা-বাবার চোখে চোখ রাখা, কোলে ওঠার জন্য হাত বাড়ানোর, চোখ ঘুরিয়ে দৃষ্টি দিয়ে মা-বাবাকে অনুকরণ করতে পারে না। তাদের নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না। অন্য শিশুদের মাঝে রাখলে দূরে গিয়ে একা বসে থাকে। অন্যদের ব্যাপারে আগ্রহ বোধ করে না। আপন মনে থাকতে পছন্দ করে। খেলনা দিলে খেলে না। অন্য কারও কোলে যায় না।তাদের ভাষা কিংবা কথা শেখানোর সময় সঙ্গে সঙ্গে কথা বলা বা আওয়াজ করে না। নিয়মমাফিক কাজ করা পছন্দ করে। পুনরাবৃত্তিমূলক আচরণ, অদক্ষতা, যোগাযোগে ব্যর্থতাÑ এ তিন বিষয়ের যে কোনোটা থাকা মানে অটিজম নয়। এ তিনটির প্রত্যেকটিরই কমবেশি লক্ষণ দেখলে বুঝতে হবে সে শিশুটি অটিস্টিক শিশু। তবে শিশুরা অটিজমে আক্রান্ত কি না, তা অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকরাই সিদ্ধান্ত দেবেন। বই বা পত্রিকা পড়ে কিংবা ইন্টারনেট ঘেঁটে উৎসর্গ মিলিয়ে ঘর বসে শিশুকে অটিস্টিক শিশু ভেবে নেওয়া উচিত নয়। তাই তো গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ এপ্রিল ‘বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। আমাদের দেশের অনেকে অটিস্টিক শিশুদের সমাজ বা পরিবারের বোঝা মনে করেন। তাদের সন্তানদের অটিস্টিক শিশুদের সঙ্গে মিশতে দেন না। আদর করতে তাদের মানইজ্জতে বাধা দেয়। আবার অনেকে এসব শিশুকে অভিশপ্ত মনে করেন। অনেকে তাদের এড়িয়ে চলেন। কাছে টেনে নিতে দ্বিধাবোধ মনে করেন। আবার অনেককে তাদের তিরস্কার করতে দেখা যায়। কিন্তু এসব করা মোটেও সমীচীন নয়। মানুষ মানুষের জন্যÑ এ কথা আমরা সবাই জানি। অটিস্টিক শিশুদের সমাজের বা পরিবারের বোঝা মনে না করে তাদের কাছে টেনে নিয়ে আদর সোহাগ দিলে তারা নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ পাবে। তাদের প্রতি আমাদের দরদমাখা দৃষ্টি দেওয়া উচিত। আল্লাহ তাদের যেমনভাবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন এতে অন্য কারও হাত নেই। আল্লাহ চাইলে আমাদেরও তো তাদের মতো তৈরি করতে পারত।তাই, শিশুদের মানসিক বিকাশগত সমস্যা অটিজমে আক্রান্তদের ভালোবাসা উচিত। এজন্য গণসচেতনতা তৈরি করা দরকার। সরকার প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক ঝুঁকি কমাতে প্রতিবন্ধী ভাতা ও প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি দিচ্ছে। অটিস্টিক শিশুদের প্রতি আমাদের সবার ভালোবাসা, ভালো ব্যবহার, পরিচর্যা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতাই পারে তাদের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে। তাদের ঘৃণার চোখে না দেখে ভালোবাসার চোখে দেখুন।

কবি ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন