ইসলাম

হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বিশ্বব্যাপী

মাওলানা নুরুজ্জামান নাহিদ

হালাল-হারাম মুসলিম জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে হালাল গ্রহণ ও হারাম বর্জন করে চলা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য। অন্যথায় আখেরাতে শাস্তি অনিবার্য। মহান রাব্বুল আলামিন সর্বপ্রথম নবী-রাসুলদের হালাল-হারাম মেনে চলার আদেশ করেছেন। এরশাদ হয়েছেÑ ‘হে রাসুলরা! পবিত্র বস্তু আহার করুন এবং সৎকর্ম করুন। আপনারা যা করেন সে বিষয়ে আমি পরিজ্ঞাত।’ (সূরা মোমিনুন : ৫১)। অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের সম্বোধন করে এরশাদ করেনÑ ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা পবিত্র বস্তুসামগ্রী আহার করো, যেগুলো আমি রুজি হিসেবে তোমাদের দান করেছি এবং শুকরিয়া আদায় করো আল্লাহ তায়ালার, যদি তোমরা তারই বন্দেগি করে থাক।’ (সূরা বাকারা : ১৭২)। হালাল পণ্য ত্যাগ করে হারামে লিপ্ত হওয়ার প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘আমার দেওয়া পবিত্র বস্তগুলো আহার করো এবং এতে সীমালঙ্ঘন করো না, তাহলে তোমাদের ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসবে এবং যার ওপর আমার ক্রোধ নেমে আসে, সে ধ্বংস হয়ে যায়।’ (সূরা ত্বহা : ৮১)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলে আকরাম (সা.) সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশে বলেছেনÑ ‘আল্লাহ তায়ালা পবিত্র। তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রেরিত রাসুলদের যেসব বিষয়ের আদেশ করেছেন, মোমিনদেরও একই জিনিসের আদেশ করেছেন।’ অতঃপর তিনি সূরা বাকারার ১৭২ নম্বর আয়াত ও সূরা মোমিনুনের ৫১ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করেন। এরপর দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া এক মুসাফিরের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার চুল আলুথালু এবং চেহারা ধূলিমলিন হয়ে গেছে। সে আল্লাহর কাছে দুই হাত তোলে দোয়া করছে, ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং তার উদরপূর্তি হয়েছে হারাম খাবার দ্বারা। তার দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম : ১০১৫)।
সুখের কথা হলো, পৃথিবীজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদা ক্রমবর্ধমানহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা হালাল ভোক্তার সংখ্যাবৃদ্ধিকে প্রতিভাত করে তুলেছে। বিগত ১০ বছরে বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে পৃথিবীর মোট খাদ্য প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোর ১৬ শতাংশের অধিক হালাল পণ্যের জোগান দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যসামগ্রী হালাল করার প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা, সেমিনার এবং প্রয়োজনীয় আইন ও নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে। উপরন্তু হালাল পণ্যের চাহিদা শুধু খাদ্যদ্রব্যে আটকে নেই; রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে শুরু করে হোটেল, ব্যাংক, ওষুধ, কসমেটিকস সর্বত্র এর চাহিদা ব্যাপকহারে সৃষ্টি হচ্ছে। পর্যটন ক্ষেত্রেও হালাল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা দেখা গেছে সম্প্রতি।
দ্য স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্টে (২০১৭-২০১৮) বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে বিশ্বে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের হালাল পণ্য ব্যবহার হয়েছে। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২২ সালে হালাল বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়াবে ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, এর পরিমাণ ৪ ট্রিলিয়ন অতিক্রম করতে পারে। একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার পরিমাণ। বর্তমানে শুধু আমেরিকান মুসলমানদের ক্রয়ক্ষমতার সূচক দাঁড়িয়েছে ১৭০ বিলিয়ন ডলার। বাড়ছে মুসলিম বিশ্বের জিডিপির হারও। ফলে বিশাল এ বাজারের দখল নিতে হামলে পড়ছে বিশ্বের উন্নত দেশ ও নামজাদা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। টেসকো, নেসলে, ম্যাকডোনাল্ডের মতো মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিগুলো আগেভাগেই বাজারে নেমে পড়েছে; হালাল পণ্যের মেন্যু তৈরি করেছে। ফলে হালাল পণ্যের এ বিশাল মার্কেটের বড় অংশটিই তাদের দখলে। উদাহরণত, সৌদি আরবের মতো মুসলিমপ্রধান দেশে হালাল মুরগি সরবরাহ করছে ব্রাজিল। হালাল উপায়ে জবাইকৃত বকরির জোগান দিচ্ছে নিউজিল্যান্ড। ব্রিটেন ও কানাডার ওষুধ কোম্পানিগুলো হালাল ওষুধ ও ভিটামিন তৈরি করে মুসলিম দেশগুলোয় রপ্তানি করছে। হালাল হিজাবি শ্যাম্পু বাজারে নিয়ে এসেছে সানসিল্ক। আতরের সুগন্ধিমাখা সাবান এনেছে লাইফবয়। অপরপক্ষে হালাল পণ্যের এ বিশাল বাজারে মুসলিমপ্রধান দেশ বাংলাদেশের অবস্থান ১৫তম।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিশ্বে হালাল ফ্যাশনের বাজার ছিল ২৫৪ বিলিয়ন ডলার। যেখানে শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে আছে ইটালি, সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদির মতো অমুসলিমপ্রধান রাষ্ট্র। চলতি বছরের ৪ এপ্রিল কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক মন্ত্রণালয় (গওঞও) এবং বৈদেশিক বাণিজ্য উন্নয়ন করপোরেশনের (গঅঞজঅউঊ) যৌথ উদ্যোগে ১৫তম আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। প্রদর্শনীর নামকরণ করা হয় গধষধুংরধ ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঐধষধষ ঝযড়পিধংব (গওঐঅঝ)। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে হালাল পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে এটিই সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী। খাদ্যদ্রব্য ও পানীয়, ফ্যাশন, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রসাধনী, অর্থায়ন বা আর্থিক সেবা, পর্যটন খাতের হালাল পণ্য ও সেবার প্রদর্শনী হয়ে থাকে এ আয়োজনে। গত বছর কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এ মেলায় মোট ৮০টি দেশের ২২ হাজার ৭৪৪ ক্রেতা-দর্শনার্থীর অংশগ্রহণে এ প্রদর্শনীতে ২৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সরাসরি বাণিজ্য হয়েছে। চলতি বছর ৭২টি দেশ থেকে মোট অংশগ্রহণকারী ছিল ২১ হাজারের অধিক। নগদ বিক্রির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭২ বিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত। চার দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর পরবর্তী সময় নির্ধারিত হয়েছে ২০১৯ সালের ৩ থেকে ৬ এপ্রিল।
এছাড়াও ২০১৪ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনী’ যাত্রা শুরু করে, যার উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত। জাপান, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, আরব আমিরাতসহ বিশ্বের মোট ৬০টি কোম্পানি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে। ২০১৭ সালের জুনে তাইওয়ানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হালাল পণ্য প্রদর্শনীতে মোট দর্শকসংখ্যা ছিল ৬৫ হাজার ৫৯৯ জন। এসব প্রদর্শনীর মূল উদ্দেশ্য হলোÑ অমুসলিম দেশগুলোতে হালাল পণ্য সহজলভ্য করা, হালাল পণ্য নিরীক্ষণের মাধ্যম সহজলভ্য করা, সচেতনতা সৃষ্টি ও ভোক্তা আকৃষ্ট করা এবং হালাল পণ্য সাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। এছাড়াও হালাল মার্কেটিংকে বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যেও এসব প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়ে থাকে।
আন্তর্জাতিক পরিম-লে হালাল পণ্যের ব্যাপক জয়জয়কার নিঃসন্দেহে মুসলমানদের জন্য আশাব্যঞ্জক। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের এক্ষেত্রে এগিয়ে আসা এবং অন্যদের পথপ্রদর্শন করা ছিল ঈমানি দায়িত্ব। আফসোসের কথা হলোÑ অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই হালাল পণ্যের বাণিজ্যে উন্নাসিকতা প্রকট। বিশেষত, বাংলাদেশের অবস্থা এক্ষেত্রে চরম শোচনীয় ও লজ্জাজনক। তথ্যমতে, ২০১১ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক হালাল পণ্যের সার্টিফিকেট দেওয়া শুরু হয়। আট বছরে মোট সার্টিফিকেট গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০টিতে। সনদপ্রাপ্ত হালাল পণ্যের সংখ্যা সাকুল্যে ১০০টি। কয়েকটি জবাইখানাও হালাল সনদ গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। গার্মেন্টস ও ফ্যাশন হাউজগুলোর এক্ষেত্রে অনাগ্রহ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ব্যবসায়ী কমিউনিটিগুলোকে এখনই হালাল পণ্যের আমদানি-রপ্তানির দিকে মনোযোগী হতে হবে। এতে ব্যবসায়ী ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আখেরাতেও তারা অধিক সওয়াবের অধিকারী হবেন। হালাল পণ্যের প্রসার ও হারাম পণ্যের বাজার হ্রাস করার বিরাট সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হবে। বিস্তর গবেষণা করে হালাল পণ্যের ব্যবসায় নতুনত্ব সৃষ্টিতে অগ্রসর হতে হবে। বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের ব্যবসাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। মুসলিমপ্রধান দেশগুলোরও উচিত হালাল পণ্য ব্যবসায়ীদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা।

Related Articles