শিরোনাম

আজ বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৩:২১ অপরাহ্


নিষিদ্ধ নোট গাইড বই বাজারে ছড়াছড়ি

নিষিদ্ধ নোট গাইড বই বাজারে ছড়াছড়ি

দেশের সব মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফল ঘোষণার পর বিদ্যালয়ের উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতেই নতুন বই তুলে দেয়া হয়েছে। প্রথম থেকে শুরু করে দশম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে পাঠ্যবই। এ দিনটি শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দের, উৎসবের। নতুন বই হাতে পেয়ে খুশিতে ভরে উঠছে তাদের মন। বিনামূল্যে বই বিতরণের উদ্দেশ্য একটাই দেশকে নিরক্ষরমুক্ত করা, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে শতভাগ সফলতার লক্ষ্যে পৌঁছানো। দেশের কোনো মানুষ যাতে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়। জাতিকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার প্রতি বছর দেশের শিক্ষা খাত উন্নত করার লক্ষ্যে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করলেও জাতি সুশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। কারণ দেশের একটি কুচক্রী মহল দ্রুত কোটিপতি হওয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। বইয়ের বাজারে গেলে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বাজারের প্রতিটি বইয়ের দোকানে সাজানো আছে নিষিদ্ধ নোট বই বা গাইড বই। সব শ্রেণীর, সব বিষয়ের গাইড বই এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের নোট বা গাইড বই মুদ্রণ ও বিক্রয় সরকারিভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে একটি মহল সেই নোট বা গাইড বই ছাপিয়ে বাজারে বিক্রি করছে। যেগুলো ভুলে ভরা। আর এ ভুলে ভরা নোট বা গাইড বই পড়ে ছেলেমেয়েরা সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারছে না। এসব বই পড়ে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারছে না। ১৯৮০ সালের নোট বই (নিষিদ্ধকরণ) আইনে এ বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ৭ বছরের সশ্রম কারাদ- অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদ- অথবা উভয় দ-ে দ-িত করার বিধান এ আইনে আছে। ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইও নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে এক রায়ে আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের এ আদেশ বহাল রাখেন।
গাইড বইয়ের চাহিদা নেই, এ কথা বলা যাবে না। চাহিদা আছে বলেই তো সব শ্রেণীর সব বিষয়ের গাইড বইয়ে বাজার সয়লাব। শ্রেণিকক্ষে যে পাঠদান করা হয়, তা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্য যথেষ্ট নয়। কম মেধাবী বা পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরে সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। তাই উপায়ান্তর না দেখে অভিভাবকরা গাইড বই তুলে দিচ্ছেন ছেলেমেয়েদের হাতে। স্কুলের আগে বা পরে পাঠাচ্ছেন কোচিং সেন্টারে। অনেক স্কুল কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট প্রকাশকের গাইড বই কেনার জন্য শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন বলে অভিযোগ আছে। এছাড়াও কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ ছেলেমেয়েদের নির্দিষ্ট লেখকের নির্দিষ্ট গাইড বই কেনার জন্য স্কুল থেকে লিস্ট দিয়ে দেয় শিক্ষার্থীদের হাতে। বলে দেয় অমুক লাইব্রেরিতে বইটি পাওয়া যাবে। বইয়ের প্রকাশকদের সঙ্গে কিছু কিছু স্কুল কর্তৃপক্ষের যোগসাজশের বিষয়টি এখন ওপেন সিক্রেট। শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীর টেক্সট বইয়ের সঙ্গে সংযোগ নেই বললেই চলে। শিক্ষা ব্যবস্থা গাইড বই আর কোচিং সেন্টারনির্ভর হয়ে পড়েছে। আমাদের বই পড়ার অভ্যাস দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে পরীক্ষাকেন্দ্রিক। তাই পরিশ্রম করে জ্ঞানার্জনের চেয়ে পরীক্ষা পাসের শর্টকাট রাস্তা আমরা খুঁজছি। গাইড বই থেকে কিছু নির্বাচিত প্রশ্নের তৈরি জবাব মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদ্্গীরণ করতে পারলেই পরীক্ষায় পাস করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব গাইড বই থেকে হুবহু প্রশ্ন নিয়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে বলে শোনা যায়।
গাইড বইয়ের প্রকাশকদের এখন পৌষ মাস; কিন্তু শিক্ষার্থীদের সর্বনাশ। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় তেমন একটা সুবিধা করতে পারছেন না অনেকেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস মার্ক পেয়েছেন ১০ শতাংশের কম। যাচ্ছেতাই অবস্থা। অভিভাবকদের মাথায় হাত।
মানুষের প্রতিভার অনেকটাই জন্মগত। উপযুক্ত পরিবেশ প্রতিভাকে লালন করে। চর্চার মাধ্যমে প্রতিভা বিকশিত হয়। নতুন কিছু জানার মধ্যে আনন্দ আছে, না বুঝে মুখস্থ করার মধ্যে তা নেই। আছে একঘেয়েমি। মুখস্থ বিদ্যার ফলে না প্রকৃত জ্ঞানলাভ হচ্ছে, না হচ্ছে মেধার চর্চা। না বুঝে মুখস্থ বিদ্যার এ হলো বিপদ। একটু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করলেই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার সময় উত্তর লিখতে পারে না। এছাড়াও আমাদের দেশের বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব রয়েছে, এটা সবারই জানা। বিশেষ করে অঙ্ক ও ইংরেজির ভালো শিক্ষকের অভাব প্রকট। যে দুই-চারজন অভিজ্ঞ শিক্ষক আছেন, তারা মহাব্যস্ত। দম ফেলার সময় নেই। কোচিং সেন্টারের নামে স্কুল খুলে বসেছেন। সাতসকালে কোচিং সেন্টার, দুপুরে স্কুল, বিকালে আবার কোচিং সেন্টার। মাঝ রাতের আগে ছুটি নেই। এভাবে প্রতিদিন ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টা একটানা পরিশ্রম করে কীভাবে শিক্ষার্থীদের প্রতি তারা সুবিচার করেন, তা জানতে চায় দেশের বিজ্ঞমহল।
এমন একটা সময় ছিল, যখন পাঠ্যবই পেতে শিক্ষার্থীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। শিক্ষার বিস্তার হয়েছে; কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের পাঠদানের মান উন্নত না হলে শুধু আইন প্রণয়ন করে গাইড বইয়ের ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। এ সত্যটি কী শিক্ষক, কী অভিভাবক, কী শিক্ষার্থীÑ সবারই উপলব্ধি করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত নির্ধারণ, মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, উপযুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যবইয়ের সংস্কার, ছুটি কমিয়ে কার্যদিবস বাড়ানোÑ এসব বিষয়ে আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে। সঙ্গে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের, শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার প্রতি আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে নোট বা গাইড বই না কিনে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। আর যারা নোট বা গাইড বই বিক্রি করেন, তাদের এসব বই বিক্রি করা বন্ধ করতে হবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বা কোমলমতি শিশুদের মেধাকে ধ্বংস করে টাকা উপার্জন করা কোনো সভ্য লোকের কাজ হতে পারে না। দেশের শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি আমার ও আপনার এগিয়ে আসা উচিত। একমাত্র শিক্ষাই পারে দেশকে উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে।

ওসমান গনি

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন