আজ বুধবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১২:৩৬ পূর্বাহ্ন


সিলেটের রেলপথ কেন বঞ্চনার শিকার?

সিলেটের রেলপথ কেন বঞ্চনার শিকার?

সেলিম আহমেদ : সাংবাদিক।

আন্তঃনগর পারাবত এক্সপ্রেস শুক্রবার (২৪ জানুয়ারি) ভোরে ঢাকা থেকে সিলেট যাচ্ছিল। যাত্রাপথে ব্রাক্ষণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের কাছাকাছি পৌঁছলেই আকস্মিক আগুন লেগে ভস্মীভূত হয় ট্রেনটির পাওয়ার কার। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান যাত্রীরা।

সিলেট রেলপথে এ দুর্ঘটনা নতুন নয়। এর আগেও বেশ কয়েকবার অগ্নিকাণ্ড সংগঠিত হয় ট্রেনে। শুধু অগ্নিকাণ্ড নয় লক্কড়-ঝক্কর, মেয়াদোত্তীর্ণ ব্রিজ আর জরাজীর্ণ কোচের কারণে সিলেটে রেলপথে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। গত বছরের জুলাই মাসে এ রেলপথের কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় ব্রিজ ভেঙে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেসের ৫টি বগি খাদে পড়ে যায়। এতে নিহত হন ৪ যাত্রী। আহত হন শতাধিক যাত্রী।

দীর্ঘদিন থেকেই বঞ্চনার শিকার হতে হচ্ছে রেলওয়ের পূর্বঞ্চল জোনের সিলেটের যাত্রীদের। শত বছরের পুরনো লক্কড়-ঝক্কড় রেললাইন আর মেয়াদোত্তীর্ণ রেল ব্রিজ। লাইনের অধিকাংশ স্লিপার পচে নষ্ট আর নাট-বল্টু, ক্লিপ চুরি হয়ে গেছে। ফলে কোনোরকম জোড়াতালি দিয়েই চলছে এ পথের ট্রেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ত্রুটিপূর্ণ এমন লাইন ব্যবহার করেই বছরের পর বছর ধরে যাতায়াত করছেন সিলেট বিভাগের চার জেলার কয়েক লাখ মানুষ। বিভিন্ন সময় রেল দুর্ঘটনায় একাধিক মানুষের মৃত্যু, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বা দিনের পর দিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে।

রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের মতে, নির্মাণের ৫০-৫৫ বছর পরই সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। অথচ এ রুটের ৯০ ভাগ সেতুর বয়সই ৭০ থেকে ১০০ বছর। রেলের তালিকায়ও এ ১৩টি স্পটকে রেলওয়ের ভাষায় ‘ডেড স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঢাকা-সিলেট রুটের অন্যান্য ট্রেনের নতুন সময়সূচি অনেকটা যাত্রীবান্ধব হলেও ঢাকা থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসের সময়সূচি সম্পূর্ণ যাত্রীস্বার্থ পরিপন্থী বলে মনে করছি। এতে বৃহত্তর সিলেটের যাত্রীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-আজমপুরের যাত্রীদের স্বার্থচিন্তা করেই এ শিডিউল করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের এমন এলোমেলো শিডিউল ট্রেন যাত্রীদের নিরুৎসাহিত করবে। এতে উপকৃত হবেন বাস মালিকগণ।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথে পারাবত, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, উদয়ন, উপবন ও কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন ১২-১৫ হাজার যাত্রী সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রামে যাতায়াত করে।

এতো কিছুর পরও সিলেটের রেলপথ মেরামত কিংবা আধুনিকায়নের জন্য তেমন পদক্ষেপ দেখা যায়নি রেল কর্তৃপক্ষের। শুধু আশ্বাস দিয়ে গেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ গত বছর কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে রেল মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, সিলেটের আখাউড়ায় রেল সড়কে ডুয়েল ব্রডগেজ হবে আর তখন সবই পরিবর্তন হয়ে যাবে। কিন্তু আজও এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

সিলেটের রেলযাত্রীরা যখন যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দাবি করে আসছেন ঠিক তখনি রেলের পশ্চিমাঞ্চলের বহরে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ট্রেন। ২০১৯ সালের এপ্রিলে ঢাকা-রাজশাহী রুটে চালু হয়েছে নতুন ট্র্রেন বনলতা এক্সপ্রেস। ঠিক এর পরের মাসে চালু হয় পঞ্চগড় এক্সপ্রেস। ঢাকা-বেনাপোল রুটে গত জুলাইয়ে চালু হয়েছে বেনাপোল এক্সপ্রেস। আর অক্টোবরে রংপুর ও লালমনি এক্সপ্রেসে সংযোজন হচ্ছে নতুন কোচ। এই রুটে আরেকটি ট্রেন চালুরও কথা রয়েছে। এভাবেই রেলের পশ্চিমাঞ্চলে একের পর এক নতুন ট্রেন ও কোচ সংযোজন হলেও অবহেলিত থেকে যাচ্ছে পূর্বাঞ্চল।

বাংলাদেশ রেলওয়েকে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল- এই দুইভাগে ভাগ করা হয়। সরকার তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে টানা নতুন ট্রেন ও কোচ যাচ্ছে পশ্চিমাঞ্চলে। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ওই অঞ্চলের এমপি। সে কারণেই প্রশ্ন উঠেছে- রেলমন্ত্রীর বাড়ির আশেপাশেই নতুন সব ট্রেনের গন্তব্য! ওই অঞ্চল থেকে আসা দাবির প্রতি তিনি দুর্বল- এমন অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে দীর্ঘদিন ধরে নতুন ট্রেন নেই বললেই চলে। নতুন ট্রেন কিংবা কোচ দেয়াতো দূরের কথা সিলেট রুটের ট্রেন থেকে এসি কোচ খুলে নেয়ার ঘটনাও দেখা গেছে। ঢাকা-সিলেট রুটে এক সময়ের জনপ্রিয় কালনী এক্সপ্রেস প্রথম শ্রেণির আন্তঃনগর হলেও এখন লোকাল ট্রেনের চেয়েও নিম্নমানের সেবা দিচ্ছে। মাত্র সাতটি কোচ দিয়ে কোনোরকমে ট্রেনটি চালানো হচ্ছে।

পূর্বাঞ্চলের রেলরুটে ননস্টপ ট্রেন, রেললাইন মেরামত আর ট্রেনে আধুনিকায়নের দাবি সিলেটেবাসীর দীর্ঘদিনের। আর ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে পুরাতন জরাজীর্ণ ট্রেন সরিয়ে নতুন কোচে ট্রেন দিতে বেশ কয়েকবার দাবি জানিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। এমনকি ডিও লেটারও দিয়েছেন রেলপথ মন্ত্রণালয়ে। এর আগেও তাঁরই বড় ভাই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেট রুটে ট্রেন চেয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু ব্যার্থ হন। নতুন ট্রেন ও কোচ বণ্টনে বারবার অবহেলিত থেকেছে ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুট।

সিলেটেরবাসীর এতোসব কষ্টের মাঝে সম্প্রতি পরিবর্তন আনা হয়েছে ট্রেনের শিডিউলে। কার স্বার্থে ট্রেনের শিডিউলে পরিবর্তন আনা হয়েছে তা বোধগম্য হচ্ছে না সিলেটবাসীর। নতুন শিডিউলে সিলেটের যাত্রীদের উপকৃত হওয়ার চেয়ে বেশি বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে।

আগে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস (আপ) ট্রেনটি ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে আগে ছাড়তো রাত ৯.৪৫ মিনেটে যা ভোর সাড়ে ৫ টায় সিলেটে পৌঁছাত। বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী উপবন (আপ) ছাড়ে রাত সাড়ে ৮ টায় এবং সিলেটে পৌঁছায় ভোর সাড়ে ৩ টা থেকে ৪ টা নাগাদ। ফলে গভীর রাতে যাত্রীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষত যেসব যাত্রী মাঝপথে (শ্রীমঙ্গল, কুলাউড়া, বরমচাল ও মাইজগাঁও স্টেশনে) নামেন তাদের বেশি ভোগান্তির শিকার হতে হয়। শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া স্টেশনে রেলওয়ে পুলিশ থাকায় সেখানে যে যাত্রীগণ নামেন তারা অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বরমচাল ও মাইজগাঁও স্টেশনের যাত্রীগণ সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীন। এ দুটি স্টেশনে রাত সোয়া ৩টা/ সাড়ে ৩ টায় নামা যাত্রীরা যে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনার শিকার হতে পারেন।

সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন (ডাউন) এক্সপ্রেস পূর্বের সময় রাত ১০ টার পরিবর্তে এখন সিলেট থেকে ছাড়ে রাত ১১.৩০ টায়। ঢাকা থেকে সিলেটগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেসটি সিলেট থেকে উপবন হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যায়। মাঝে মধ্যে জয়ন্তিকা সিলেট পৌঁছোতে দেরী করলে তো আর যাত্রী ভোগান্তির সীমা থাকে না। তার ওপর নতুন সময়সূচি অনুযায়ী বিলম্ব হলে ট্রেন ছাড়তে রাত ১টাও বাজে। এতে মধ্যপথে ওঠা যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েন।

আন্তঃনগর কালনী এক্সপ্রেস (আপ) আগে ঢাকা থেকে ছাড়তো বিকাল ৪ টায়। যাত্রীরা নিজেদের অফিশিয়াল কাজ সেরে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে পারতেন। যদিও দীর্ঘদিন যাবত সিলেটবাসীর দাবী ছিলো কালনী (আপ) ট্রেনের যাত্রার সময় আরো পিছিয়ে ৫ টা বা তার পরে করার। তা না করে উল্টো কালনী (আপ) ট্রেনের যাত্রার সময় ১ ঘন্টা এগিয়ে ৩টা করা হয়েছে। এতে বৃহত্তর সিলেটের যাত্রীগণ মোটেও উপকৃত হবেন না।

ঢাকা-সিলেট রুটের অন্যান্য ট্রেনের নতুন সময়সূচি অনেকটা যাত্রীবান্ধব হলেও ঢাকা থেকে সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেসের সময়সূচি সম্পূর্ণ যাত্রীস্বার্থ পরিপন্থী বলে মনে করছি। এতে বৃহত্তর সিলেটের যাত্রীদের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়ীয়া-আজমপুরের যাত্রীদের স্বার্থচিন্তা করেই এ শিডিউল করা হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের এমন এলোমেলো শিডিউল ট্রেন যাত্রীদের নিরুৎসাহিত করবে। এতে উপকৃত হবেন বাস মালিকগণ।

অন্যদিকে রেলের বেহাল দশাকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন বাস মালিকরা। ঢাকা-সিলেট রুটে গত তিন বছরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাস সংখ্যা বেড়েছে। চালু হয়েছে এনা পরিবহনের হুন্দাই বাস। এছাড়া যুক্ত হয়েছে গ্রিন লাইন ও লন্ডন এক্সপ্রেসের হাইডেক এসি বাস। তবে কি বাস মালিকদের স্বার্থেই বঞ্চিত করা হচ্ছে সিলেটের রেলযাত্রীদের।

সেলিম আহমেদ : সাংবাদিক। 

ই-মেইল : selimnews18@gmail.com

শেয়ার করুন