শিরোনাম

আজ বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ০৩:১৯ অপরাহ্


ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে সরকার

ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে সরকার

রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারের ব্যাংক ঋণের হার বাড়ছে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেটে সরকার পুরো অর্থবছরের জন্য ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল, ছয় মাসেই সে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি গত পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ২৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

ঘাটতি মেটাতে সরকারকে নিরুপায় হয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এতে করে বেসরকারি খাত ঋণপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্য দিকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কমে যাওয়ার কারণেও সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা বাড়ছে।

এদিকে রাজস্ব আদায় কম হওয়া এবং ব্যাংক থেকে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার বেশি ঋণ নেওয়াকে অর্থনীতির জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস থেকে শুরু হওয়া রাজস্ব আহরণের নিম্নগতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রতি মাসেই রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ঘাটতির পরিমাণ বাড়ছে। নতুন ভ্যাট আইন পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়া, বিভিন্ন পণ্যে রাজস্ব অব্যাহতিসহ নানা কারণে রাজস্ব আহরণে গতি ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে এনবিআর।

রাজস্ব আহরণের তিনটি বড় খাতের মধ্যে অন্যতম হলো ভ্যাট। প্রতি বছরই ভ্যাটকে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচনা করে বাজেট প্রণয়ন করে সরকার। চলতি অর্থবছরে প্রস্তুতি ছাড়াই রাজস্ব আহরণ বাড়াতে নতুন ভ্যাট আইন করা হয়, যার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে গত বছরের জুলাই থেকে। কিন্তু নতুন ভ্যাট আদায়ের প্রস্তুতি না থাকায় বড় একটা প্রভাব পড়ছে ভ্যাট আদায়ে। এদিকে আমদানি আগের তুলনায় কমে যাওয়ায় কাস্টমস হাউসেও কমেছে রাজস্ব আদায়। আর কিছু পণ্যে দেশের শিল্পায়নের জন্য আমদানি পর্যায়ে অব্যহতি দেওয়ায় কমেছে রাজস্ব আদায়। বিশেষ করে বৈশ্বিক অর্থনীতির নিম্নগতিরও একটা প্রভাব পড়েছে আমদানিতে।

এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির কারণে সরকারের ব্যাংক ঋণ বাড়ছে। এতে কমে যাবে বেসরকারি খাতে ব্যাংকের ঋণ প্রবাহ। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। কমে যেতে পারে উৎপাদন, পাশাপাশি কর্মসংস্থানও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। অথচ অর্থবছরের ছয় মাসের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে সরকার। সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত এ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে ৫১ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার থেকে ইতিমধ্যে ৪ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে।

এ সম্পর্কে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, সরকার যেভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে তা নজিরবিহীন। এটা অব্যাহত থাকলে ঋণের পরিমান ১০০ হাজার কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এই ঋণ নেওয়ার ফলে ব্যাংকের তারল্য সংকট আরও বাড়বে এবং এটি শেষ পর্যন্ত বেসরকারি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলবে। তিনি সরকারের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে এই অবস্থার জন্য রাজস্ব সংগ্রহে পর্যাপ্ত চেষ্টা না করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের অদূরদর্শিতাকে দায়ী করেন।

এনবিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে অর্থাৎ জুলাই-নভেম্বর ১৯ পর্যন্ত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। আলোচ্য সময়ে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৮১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৫ মাসে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা। আর রাজস্ব আদায়ের গড় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।

রাজস্ব আদায়ে সবচেয়ে পিছিয়ে ভ্যাট খাত। আলোচ্য সময়ে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪২ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৩১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। শুধু ভ্যাট আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। আর কাস্টমসে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২৫ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা। ৫ মাসে কাস্টমসে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা। ঘাটতি কম শুধু আয়কর খাতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসে আয়করে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ২৪ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। আয়করে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রাজস্ব আয় কম হওয়ায় সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নিচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে গেছে। সরকার যে সুদহার কমানোর পরিকল্পনা করছে আর সরকার যেভাবে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে তাতে সরকারই সুদহার কমানোর বড় বাধা হয়ে দাড়াবে।

শেয়ার করুন